কবে হবে জনগণের সিন্ডিকেট?
অনলাইন নিউজ ডেক্স
বেশ কয়েকদিন থেকে কাঁচামরিচ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড চলছে। শেয়ারবাজারের মতো মুহূর্তে মুহূর্তে দামের তারতম্য হচ্ছে। এক কেজি কাঁচামরিচের দাম ১২০০ টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। বিভিন্ন সময় পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, লবণ, তেলসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার সরগরম থাকে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও মোটা দাগে আমরা সিন্ডিকেটকেই দায়ী করে থাকি। কাঁচামরিচের বাজারের দিকে নজর দিলেই দেখা যায় সিন্ডিকেটের কাছে আমরা কতটা অসহায়।
এর দায়ভার শুধু সিন্ডিকেটকে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না; এর জন্য ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সরকার সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য একচেটিয়াভাবে সিন্ডিকেটকে দায়ী করলে হবে না, ক্রেতা হিসাবেও আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে, ভোক্তারা যদি সুযোগ করে দেয়, তাহলে সিন্ডিকেট সহজেই তা লুফে নেয়। লবণকাণ্ডের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, পর্যাপ্ত লবণের মজুত থাকা সত্ত্বেও ক্রেতাদের কারণে দোকানিরা লবণের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সিন্ডিকেট নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তোপের মুখে পড়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, বড় বড় সিন্ডিকেটের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই। বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির সাম্প্রতিক মন্তব্যের সারসংক্ষেপ হলো-কম খাওয়া, কম বাজার করা, মিতব্যয়ী হওয়াই এ সমস্যার সমাধান। কিন্তু গুটিকয়েক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে গোটা দেশের মানুষ জিম্মি থাকবে, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। আমরা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কথা শুনে থাকি, বিভিন্ন ইউনিয়নকে দেখেছি সংঘবদ্ধভাবে যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে; কিন্তু জনগণের, সাধারণ ক্রেতাদের কোনো সিন্ডিকেট আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নজির মনে হয় একমাত্র বাংলাদেশেই আছে। যেখানে মন্ত্রণালয়ও অনেকটাই অসহায়, সেখানে জনগণের সিন্ডিকেটই পারে সব সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে।
চামড়ার বাজারের দিকে নজর দিলেও দেখা যায় পাঁচ-সাত বছর ধরে কীভাবে চামড়ার দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে। যেখানে চামড়ার চাহিদা দিনদিন বাড়ছে, সেখানে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এত বেশি যে, মাঝেমধ্যে সরকারও তাদের কাছে অসহায়। বাণিজ্যমন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে নাকি অবস্থা আরও খারাপ হবে। তাহলে কি আমরা সাধারণ মানুষ সবসময় এভাবেই সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি থাকব? যেখানে সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’, সেখানে কোথায় জনগণের ক্ষমতা? তবে এটি বলা যেতেই পারে, গুটিকয়েক অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীই সব ক্ষমতার উৎস; এমপি-মন্ত্রীরা যেখানে একরকম আত্মসমর্পণ করেছেন। তাহলে কি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি থাকতে হবে আমাদের? যে জনগণকে আমরা ‘সকল ক্ষমতার উৎস’ মনে করি, সেই জনগণকে সোচ্চার হতে হবে, জনগণের সিন্ডিকেট তৈরি করে তা শক্তিশালী করতে হবে।
এবার আসি জনগণের সিন্ডিকেট গড়ে তোলা আদৌ সম্ভব কি না, সে প্রসঙ্গে। এ প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিশেষ করে রাজনৈতিক সাংস্কৃতি, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের আমূল পরিবর্তন করলেই জনগণের সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে। এজন্য পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে।
তবে এক্ষেত্রে সরকারকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার চাইলেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে দিতে পারে, তা আমরা পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচকাণ্ডের দিকে তাকালে বুঝতে পারি। সরকার যখনই কাঁচামরিচ আমদানির ঘোষণা দিয়েছে, তখনই কাঁচামরিচের দাম কমতে শুরু করেছে। এভাবে বিদেশনির্ভর হলে বাজারব্যবস্থা চলে যাবে বিদেশিদের হাতে, দেশীয় কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন দেখেছি চিনিসহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা ধনী-গরিব সবারই। সেক্ষেত্রে ধনীদের সমস্যা না হলেও মধ্যম শ্রেণি ও গরিবদের টিকে থাকতে কষ্ট হয়। সেজন্য আমাদের ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে যেন কোনো রকম কারসাজি না করে, মানবিক দৃষ্টিকোণ বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় নিয়ে হলেও তাদের সৎ থাকাটা জরুরি।
এবার আসি আইনের কথায়। উন্নত বিশ্বে যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনে নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্ক ভূমিকা পালন করা হয়। কেউ যেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত খাদ্য মজুত না করতে পারে, সেজন্য কঠোর তদারকি চালানো হয়। অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আইনও যথেষ্ট শক্তিশালী; আইনে বলা হয়েছে, ‘কেউ মজুতদারি বা কালোবাজারে লেনদেনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তার আজীবন কারাদণ্ড বা চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। যদি প্রমাণ হয় যে, মজুতদার কোনো লাভের জন্য পণ্য মজুত করেনি, তাহলে ৩ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।’ তবে ভোক্তা অধিকারের ঝটিকা কয়েকটি অভিযান বাদ দিলে এ আইন এখনো পর্যন্ত প্রয়োগ হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। আইন শুধু কাগজে-কলমে থাকলে এমন পরিস্থিতি থেকে শত বছরেও মুক্তি মিলবে না; আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
যেখানে দেশের জনগণ ও আইন এ সিন্ডিকেটকে শাস্তির আওতায় আনার পক্ষে, সেখানে এত কীসের ভয়?
সাইফুল ইসলাম : প্রভাষক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
saiful@pad.brur.ac.bd
