ছয় দেশের রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনারদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা (এসকর্ট বা চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তা সুবিধা) প্রত্যাহার করা হয়েছে ১৪ মে থেকে। এ নিয়ে নানা মহলে নানান আলোচনা চলছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের সুরক্ষা ইস্যুতে ভিয়েনা কনভেনশন মনে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশের কোনো কূটনীতিক অন্য দেশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পান কি না, তা জানতে চান অনেকেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভিয়েনা কনভেনশন মেনেই কূটনীতিকদের নিরাপত্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ।
ভিয়েনা কনভেনশন শুধু ছয়টি দেশের জন্য নির্ধারিত নয়। সব দেশের কূটনীতিকদের জন্যই সমান। ভিয়েনা কনভেনশন এসকর্ট সুবিধা দিতেও বলে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি একেক দেশের জন্য একেক রকম। তাই বাংলাদেশে ছয়টি দেশের রাষ্ট্রদূতদের এসকর্ট প্রত্যাহারে কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় ভিয়েনা কনভেনশনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনারদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসকর্ট প্রত্যাহার হলেও রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য সংস্থা ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব আগের মতোই পালন করবেন। তাই তাদের নিরাত্তায় কোনো ঘাটতি থাকছে না উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
আনসার-ভিডিপিতে একটি প্রটেকশন গার্ড রেজিমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। সব ভিআইপি, মন্ত্রী, মন্ত্রীদের বাসা এবং কেপিআইভুক্ত স্থাপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আনসারদের দেওয়া হবে। কোনো রাষ্ট্রদূত চাইলে তাদের এ সুবিধা দেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছয় দেশের কূটনীতিকদের বাড়তি নিরাপত্তার জন্য যে পরিমাণ ফোর্স প্রয়োজন হতো তার সংখ্যা ৫০-এর কম। এর মধ্যে আমেরিকান দূতাবাসের জন্য আট, ব্রটিশ ও ভারতীয় হাইকমিশনের জন্য সাতজন করে এবং সৌদি দূতাবাসের জন্য পাঁচজন পুলিশ সদস্য এসকর্টের দায়িত্বে ছিলেন।
কূটনীতিক ও কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তার জন্য এই মুহূর্তে ৮১৮ জনবল নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫৬ জন জনবল রয়েছে আমেরিকান দূতাবাসের জন্য।
এছাড়া ব্রিটিশ হাইকমিশনের জন্য ২৭, ভারতীয় হাইকমিশনের জন্য ৫৮, সৌদি দূতাবাসের জন্য ৫৬, জাপানের জন্য ২৭ এবং অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসে ১৫ জন ফোর্স এই দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া ফ্রান্স দূতাবাসে ২২, জার্মান ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসে ১৫ জন করে; মিয়ানমার, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া থাইল্যান্ড, কানাডা, ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ১২ জন করে; আরব আরিমাতের জন্য ১৮ জন, রাশিয়ার জন্য ৩৩ জন, চীনের জন্য ২৪ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
ইরান দূতাবাসের নিরাপত্তায় রয়েছেন ১৬ জন পুলিশ সদস্য। ইতালি দূতাবাসের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেন ১১ জন পুলিশ সদস্য। নয়জন করে পুলিশ সদস্য কাজ করছেন মালয়েশিয়া, কুয়েত নরওয়ে, ভুটান ও মিসরের মিশনে। ছয়জন করে ফোর্স রয়েছেন আলজাজিরা, ব্রুনাই, মালদ্বীপ, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, তুরস্ক, শ্রীলংকা, স্পেন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কসোভো, ভিয়েতনাম, আইওএম অফিস, আইএফসি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং নরডিক ক্লাবের জন্য। তিনজন করে ফোর্স রয়েছেন ফিলিপাইন, মরক্কো, নেপাল, ভ্যাটিকান সিটি, সুইজারল্যান্ড, কাতার, ওমান, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল ও সুইডেন মিশনের নিরাপত্তায়।
তিনজন করে পুলিশ সদস্য নিরাপত্তায় কাজ করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব, ইউএনএইচসিআর, টেকনো প্রমেট অফিস, বিমসটেক ও ইউনিসেফ অফিসে। চারজন করে পুলিশ সদস্য কাজ করছেন আমেরিকান ও জাপানি স্কুলে।
জানতে চাইলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার ফারুক আহমেদ জানান, বিশেষ পরিস্থিতিতে ছয়টি দেশের কূটনীতিকদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
এখন আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। জঙ্গি দমনে বিশ্বের রোল মডেল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই কূটনীতিকদের বাড়তি নিরাপত্তা সুবিধা প্রয়োজন নেই। এছাড়া আমাদের ফোর্স সংকট আছে।
তাই আপাতত এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুলিশের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের বাড়তি কোনো নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়া হয় না।
শুধু নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার গানম্যান সুবিধা পেলেও সার্বক্ষণিক এসকর্ট বা নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়া হয় না। এছাড়াও বাইরে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোয় বাংলাদেশের বিশেষ কোনো জাতীয় উৎসব আয়োজনের সময় পুলিশি নিরাপত্তা চাওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে থাকে।
সূত্রমতে, ২০০৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের তৎকালীন হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর সিলেটে গ্রেনেড হামলা হয়। এরপর থেকে তাকে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের অন্য হাইকমিশনাররাও এই নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর থেকে আরও কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা হয়।
