চ্যালেঞ্জ নিয়ে সফল তাঁরা


চ্যালেঞ্জ নিয়ে সফল তাঁরা
গ্রাহকদের জন্য নিত্যনতুন ডিজাইনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করছেন নারী উদ্যোক্তা তাসলিমা মিজি। তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘গুটিপা’–এর পণ্য এখন বাংলাদেশ ছাড়াও কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সাড়া ফেলেছে। অথচ মাতৃত্বের দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ায় সাংবাদিকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিতে হয় তাঁকে। পরে নিজের সুবিধামতো সময়ে কাজ করার তাড়না থেকেই ২০১৬ সালে শুরু করেন লেদারিনা কোম্পানির মাধ্যমে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবসা। গ্রাহকদের জন্য নতুন সব ডিজাইনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে প্রতিষ্ঠিত করেন গুটিপা। এখন লেদারিনার কারখানাতে ৫০ জনেরও বেশি কর্মী কাজ করেন, যাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী। ‘গুটিপা’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসলিমা মিজি বলেন, নারীর চলার পথটা মসৃণ নয়। পুরুষের তুলনায় মেহনত করতে হয় বেশি। তবে ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ সফল হবেন। তিনি বলেন, মানুষ মেয়েদের সবসময় বুটিক বা পার্লার চালাতে দেখে অভ্যস্ত। তারা ভাবেনি, এই ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের কখনও কোনো মেয়ের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এসব পুরোনো ধ্যানধারণার সঙ্গে যুদ্ধ করে আসতে হয়েছে। তাসলিমা মিজির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথটা সহজ ছিল না। নানা প্রতিবন্ধকতা ঠেলে আজ তিনি নিজ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর ওই পথ ধরেই হেঁটে চলেছেন বাংলাদেশের অসংখ্য নারী। হেঁসেল ঠেলা, সন্তান পালন সব যেন এক হাতে করছেন। শুধু তাই নয়, শত শত নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন নারী উদ্যোক্তারা। অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম অর্জন বীরদর্পে নারীর এগিয়ে চলা। আন্দোলনের সেই পথ ধরে এ বছরও আগামীকাল বুধবার (৮ মার্চ) বিশ্বব্যাপী পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশীদারিত্ব এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজন ও কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হবে। এবারের নারী দিবসের স্লোগান ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, জেন্ডার বৈষম্য করবে নিরসন’। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে নারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অনেক। বর্তমানে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা খাতে বার্ষিক মূল্য সংযোজন (ভ্যাট) ৩ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেড় দশক আগেও পুরুষেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এ ব্যবসায়। নারীদের অংশগ্রহণ ছিল দেড় শতাংশেরও নিচে। তবে এ পরিসংখ্যান পাল্টেছে। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায় এখন নারীদের অংশগ্রহণ ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এক দশকের ব্যবধানে নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি– বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ট্রেড সার্ভে-২০২০ এর জরিপে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল দুই লাখেরও বেশি যা ২০০২-০৩ অর্থ বছরে ছিল মাত্র ২১ হাজার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের (এসএমই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সব মিলিয়ে ব্যবসায় অনেকটা আঘাত এসেছে। তার মধ্যেও ঘরে বসে নারীরা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন বেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ৩ লাখ নারী উদ্যোক্তা অনলাইনে ব্যবসা করছেন। অথচ করোনার আগে এ সংখ্যা ছিল এক-দেড়শ। সাহসী উদ্যোক্তা সাবরিনা জামান : নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সফল ও সাহসী উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ইমপ্যাক্ট পিআর-এর প্রধান নির্বাহী সাবরিনা জামান। ইংল্যান্ডে পড়ার সময় দেশের প্রতি টান আর নতুন কিছু করার তাগিদ থেকে ২০০৫ সালে ইমপ্যাক্ট পিআর প্রতিষ্ঠা করেন সাবরিনা। সেই সময় অনলাইনে কাজ করলেও ২০০৮ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। তার পর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ইমপ্যাক্ট পিআরের পাশাপাশি তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছে ইনফো পাওয়ার লিমিটেড, ইনফো স্টেশন ও ডিজিটাল স্টেশন নামে আরও ৩টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রথম দু’জনের হাত ধরে প্রতিষ্ঠান শুরু করলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে অর্ধশতাধিক লোক কাজ করছেন। সাবরিনা জামান বলেন, প্রকৃত অর্থে পিআর যে আলাদা একটি সার্ভিস সেক্টর হতে পারে, সেটা নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ করে ইমপ্যাক্ট পিআর। বাংলাদেশে এ ধরনের কাজের ব্যাপক সুযোগ থাকলেও অর্থসংকটের কারণে আমরা নিজ থেকে কাজটা শুরু করতে পারেনি। যে কারণে আমরা উদ্যোক্তা খোঁজা শুরু করলাম। এই আইডিয়া নিয়ে দেশের বড় বড় কয়েকটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বোঝানোর চেষ্টা করলাম, দেশে পিআর নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তখন দুটি কোম্পানি ছাড়া কেউ তেমন সাড়া দেয়নি। এখন দেশে ‘পিআর ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। প্রকৃতি রক্ষায় কাজে জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু : পশুর নদ পেরিয়ে ঢাংমারী খালঘেঁষা গোলপাতার ঘর ইরাবতী। মোংলার দাকোপ উপজেলার পশ্চিম ঢাংরামী গ্রামটিই এখানকার শেষ লোকালয়। সারাদেশে সিংহভাগ তরমুজ যায় এখানকার চাষিদের মাঠ থেকে। পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত এ এলাকার স্থানীয় মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততায় চলে ইরাবতী ইকো রিসোর্টের পর্যটকের খাবারসহ আপ্যায়ন। অনিন্দ্য সুন্দর এই রিসোর্টের আয়ের অনেকটা অংশ সরাসরি পান এলাকার মানুষ। কথাগুলো বলছিলেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন পর্যটন খাতকে। গাইড, স্পট বাছাই, বাজেটিং– সবকিছু এখন তিনি একাই করেন। সুন্দরবন, নিঝুমদ্বীপ, বান্দরবানসহ সারাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ান এই নারী উদ্যোক্তা। ২০২০ সালের মার্চ থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঝটিকা সফর’। জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু বলেন, ভ্রমণের নেশা বহু পুরোনো। তবে কমন জায়গায় যেখানে সবাই ভিড় করেন, তা এড়িয়ে ভিন্ন রকম জায়গায় যেতে ভালো লাগে। ভ্রমণের নামে পর্যটন স্পট ধ্বংসের বিরুদ্ধে এক ধরনের লড়াইয়ে নামার সময় চলে এসেছে। কাকলি খানের ‘শুদ্ধকৃষি’: ২০০৯ সালে কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কাকলির খানের ফুপু। তাঁর মৃত্যু পুরো পরিবারকে শোকাগ্রস্ত করে তোলে। কেন দুটি কিডনি অকালে নষ্ট হয়ে গেল– এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারে খাদ্যের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে যাওয়ায় এই অকস্মাৎ মৃত্যু। এর পরই তিনি নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। গড়ে তোলেন ‘শুদ্ধকৃষি’। কাকলি খান বলেন, নিরাপদ খাদ্য, বিষমুক্ত বা ফরমালিনমুক্ত খাদ্য নিশ্চিতে কাজ শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। যেমনটা আমি করেছি। যদিও শুরুর গল্পটা ভালো ছিল না। পরিবারের মানুষের কাছে ‘পাগল’ ডাকও শুনতে হয়েছে। কিন্তু এখন সবাই আমার পক্ষে। রাজধানীর গ্রিন রোডে কমফোর্ট হাসপাতালের বিপরীত পাশে গড়ে তোলা ‘শুদ্ধকৃষি’ এখন সবার কাছে জনপ্রিয় ও নিরাপদ হয়ে উঠেছে। এখানে নানা প্রকারের সবজি, তেল, ঘি থেকে শুরু করে সব ধরনের নিরাপদ খাদ্যের ভান্ডার গড়ে তুলেছেন তিনি।