টিকার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৫৮৯ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর এ সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত বছর ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এতদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল এটি। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫৯ হাজার ৭১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
ডেঙ্গু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ায় ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর এ সংখ্যা সামনে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। ৩০ জুলাই ডেঙ্গুবিষয়ক ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিরোধী টিকাদান কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনায় করা হচ্ছে। অধিদপ্তরের এমন তথ্যে জনমনে আগ্রহ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। তবে সরকার ডেঙ্গুর টিকা বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বৃহস্পতিবার বলেন, দেশের মানুষ ডেঙ্গুর ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ বা ডেন-৪ যে ধরনেই আক্রান্ত হোক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ চিকিৎসা দেওয়া। এজন্য চিকিৎসা প্রটোকল আছে। এখন পর্যন্ত সেটিই অনুসরণ করা হচ্ছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নতুন কোনো প্রটোকল বা কৌশল নিয়ে ভাবা হচ্ছে না। ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ বা ধরন রয়েছে। কিন্তু সব ধরনের নির্ধারিত টিকা এখন পর্যন্ত বের হয়নি। এছাড়া যে কোনো প্রটেকশন (সুরক্ষা) দিতে হলে সেটি সবার জন্য নিশ্চিত করতে হয়। না হলে রাষ্ট্র সেটিকে পেট্রোনাইজ (পৃষ্ঠপোষকতা দান) করবে না। তবে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ফ্রান্সসহ কিছু দেশে ডেঙ্গুর টিকা নিচ্ছেন।
দেশে চলমান ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় মশা নিধনের পাশাপাশি ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগে মনোনিবেশ এবং এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নীতিনির্ধারকদের তাগিদ দিয়েছেন ভাইরোলজিস্টরা। তারা জানান, ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে এ টিকা অনুমোদন পেয়েছে। টিকাগুলোর ডেঙ্গু প্রতিরোধ সক্ষমতা ৮০ শতাংশের উপরে। ৯০ শতাংশ টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ভারতে টিকা উৎপাদনকরী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট প্যানাসিয়া বায়োটেক বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য আবেদন করেছে। বাংলাদেশেও ওই টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা যায় কিনা তা ভেবে দেখছে। বিষয়টি নিয়ে ৮ আগস্ট জাতীয় টিকাসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) বৈঠক হতে পারে। নাইট্যাগের এক সদস্য বলেন, ডেঙ্গুর টিকা বাংলাদেশে আনার সম্ভাব্যতা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করতে অনুরোধ করেছেন তারা। কিন্তু ডেঙ্গুর টিকা এখন পর্যন্ত কোথাও তেমন কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। মালয়েশিয়ায় ট্রায়াল দিয়েছিল। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য তারা বাতিল করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত এমন কোনো টিকা তৈরি হয়নি যা চার ধরনের বিরুদ্ধেই কাজ করে। এরপরও ফ্রান্সে ডেনভেক্সিয়া এবং জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালস কিউডেঙ্গা নামে দুটি ভ্যাক্সিন বাজারজাত করছে। ফ্রান্সের টিকাটি শুধু ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সিদের দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আগে একবার যারা ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছিল তাদের প্রয়োগ করা হচ্ছে। টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অন্যদিকে কিউডেঙ্গা নামে জাপানের টিকা ৬ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। এতে দেখা যাচ্ছে দুটি টিকাই সব বয়সিদের জন্য উপযুক্ত নয়। সবার জন্য উপযোগী না হওয়ায় এটা না আনার জন্যই পরামর্শ দেব।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত একদিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে ১ হাজার ৪৮৮ জনই ঢাকার বাইরের। ঢাকায় ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১০১ জন। বুধবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ হাজার ২১০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৬৫০ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৪ হাজার ৫৬০ জন। এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। জুনে যেখানে ৫ হাজার ৯৫৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। জুলাইয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন। জুনে ৩৪ জনের মৃত্যু হলেও জুলাইয়ে প্রাণ যায় ২০৪ জনের। আর আগস্টের প্রথম তিন দিনে ৭ হাজার ৮৮৪ রোগী ভর্তি হয় হাসপাতালে। মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের।
