মাগুরার কৃতি ব্যাক্তিত্ব একুশে পদক প্রাপ্ত মরহুম ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দিন


মাগুরার কৃতি ব্যাক্তিত্ব একুশে পদক প্রাপ্ত মরহুম ওস্তাদ মুন্সী রইস উদ্দিন
বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে যে কতিপয় ক্ষণজন্মা পুরুষের নাম নিয়ে গর্ব করা যায় তাদের মধ্যে ওস্তাদ মুনশি রইস উদ্দিন প্রথম সারির এক ব্যক্তিত্ব। সংগীতের ভূবনে অনন্য সৃজনশীলতার সুদীর্ঘ পথ ধরে এই ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটে। প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, উচ্চাঙ্গ কণ্ঠশিল্পী ও মধুকণ্ঠের অধিকারী একাধিক সংগীত গ্রন্থের প্রণেতা মুন্শী রইস উদ্দিনের (১৯০১-১৯৭৩) জন্ম মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে, ২৩ পৌষ ১৩০৮ সনে (১৯০১)। পিতার নাম মুন্‌শী আব্বাস উদ্দিন এবং মাতার নাম জোবেদা খাতুন, পিতা মুনশী আব্বাসউদ্দিন । দরিদ্র অথচ সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্ম। ওস্তাদ মুন্‌শী রইস উদ্দিন ১৯০১ সালে মাগুরার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে ঐতিহ্যবাহী মুন্‌শী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকাল থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। লেখাপড়া এবং খেলাধুলার চেয়ে গানবাজনার দিকেই তার ঝোঁক এবং উৎসাহ দেখা যায়। স্কুল শিক্ষকদের কাছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুখেমুখে যে সব গান শিখতেন, নিজে নিজে সেগুলো হারমোনিয়ামে তুলতে চেষ্টা করতেন। পিতার অজান্তে ফুফাত ভাই তৎকালীন উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী শামসুল হকের কাছে সংগীতের তালিম গ্রহণ করেছিলেন। মেধাবী ছাত্র ছিলেন মুন্সী রইসউদ্দীন। দশ বছর বয়সে মাতৃবিয়োগের পর বিমাতার হাতে লালিত-পালিত হন। সঙ্গীতের প্রথম পাঠ গ্রহণ করেন ফুফাতো ভাই উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী শামসুল হকের কাছে। ওনার বাবা খুব ধর্মপ্রান ছিলেন বিধায় ছেলের সঙ্গীতের প্রতি আসক্তিকে মোটেই প্রশ্রয় দিতে চাইতেন না এবং বাঁধা প্রদান করতেন সঙ্গীতের বিষয়ে । এমতাবস্থায় নিজের মনের খোরাক সঙ্গীতকে পাকাপাকি ভাবে সাথী করে নেয়ার জন্য ম্যাট্রিক পাস করে গ্রাম ছেড়ে কোলকাতায় চলে যান এবং সেখানে গিয়ে একটি স্টোরে সেলসম্যানের চাকরি পান । এরপরই শুরু হয়ে সেই পুরনো নেশার লাটিমে লতি জড়ানো অর্থাৎ সঙ্গীতকে আবার খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া । এবার তিনি কোলকাতা গিয়ে সেখানকার প্রসিদ্ধ সংগীতবিদ নুলো গোপাল বাবুর প্রধান শিষ্য রামবিহারী মল্লিকের কাছে ধ্রুপদ ও খেয়ালের তালিম শুরু করেন। ১২ বছর ধরে ওস্তাদ রাসবিহারী মল্লিকের কাছে ধ্রুপদ ও খেয়ালে তালিম নেন। আর্থিক সংকট তাঁর কলকাতার সংগীত শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত হতে থাকে তথাপি তিনি সেই অভাবের মধ্যেই চালিয়ে যেতে থাকেন সঙ্গীত সাধনা । সংকট মোচনের জন্যে তিনি আরেকটু বেশী বেতনে অর্থাৎ সাতাশ টাকা বেতন সাপেক্ষে পুরনো চাকরী ছেড়ে ‘ওয়েলম্যান স্টোরে’ আবারও সেল্‌সম্যানের চাকরিতে নিয়োজিত হন । বেশ বহু বছর সেখানে থেকে সঙ্গীতে তালিম নিয়ে ফিরে আসেন জন্মভুমিতে । চলে আসেন কুষ্টিয়া এবং সেখানকার কুষ্টিয়া মিলে চাকুরি নেন এবং সংগীত বিদ্যালয় খুলেন। পরে মাগুরা, নড়াইল ও খুলনাতে সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আবারও কলকাতায় চলে আসেন সুরের সন্ধানে । স্বগীয়ত গীর্জা শংকর চক্রবর্তী মহাশয়ের কলিকাতা সংগীত কলাভবনে এসে সুদীর্ঘ সন্ধানের সমাপ্তি ঘটে । গুরুজীর ভাগ্নে স্ত্রী যামিনী গাঙ্গুলীর (ডক্টর অব মিউজিক) তার কাছে প্রথমে পাঠগ্রহণ শুরু করেন। এর পর থেকে শুরু হলো গুরুজীর কাছ থেকে পাঠ গ্রহণের পালা। অতি অল্প দিনের মধ্যেই সেখানে মুন্সী রউচউদ্দিন সংগীতে খুবই খ্যাতি অর্জন করেন। দীর্ঘদিন শিক্ষাগ্রহণের পর ১৯৪২ সালে কলকাতা সংগীত কলাভবন থেকে সম্মানসূচক সার্টিফিকেট লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে ওস্তাদ মুন্‌শী রইস উদ্দিন (ছদ্দনামে আর মুন্সী অর্থাৎ রবীন মুন্সী নামে) কলকাতা বেতারে সংগীত পরিবেশন করেন। স্বর্গীয় শরজিৎ কাঞ্জিলালের কাছেও গানের তালিম নেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর (১৯৪৪) পর মুর্শিদাবাদের সৈয়দা আলেয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। দেশ বিভাগের (১৪ আগস্ট ১৯৪৭) পর কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় এসে বেতারের শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। নারায়ণগঞ্জ সঙ্গীত বিদ্যালয় পুনর্গঠন করেন এবং এর অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা)-এর (প্রতিষ্ঠা ১ জুলাই ১৯৫৫) প্রতিষ্ঠাতা সহ-অধ্যক্ষ ছিলেন এবং ১৯৬৪ সালে এর অধ্যক্ষ হন। সঙ্গীতের নতুন নতুন রাগের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাত ছিলেন। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সঙ্গীতপাঠ্য বিষয়ভুক্ত হলে গ্রন্থ রচনা ও পাঠক্রম প্রণয়নে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। সঙ্গীত পরিচয়, প্রবেশিকা সঙ্গীত শিক্ষা পদ্ধতি, অভিনব শতরাগ, গীত লহরী, ‘ছোটদের সা-রে-গা-মা’ তার সঙ্গীতবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অভিনব শতরাগ গ্রন্থের জন্য ‘দাউদ পুরস্কার’ লাভ (১৯৬৬) করেছিলেন। সঙ্গীতে গবেষণার ক্ষেত্রে অবদান রাখায় পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ’৬৭ সালে ‘প্রাইড-অব-পারফরম্যান্স’ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। বিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষার জন্যে ১৯৬০ সালে তাঁর রচিত ‘প্রবেশিকা সংগীতশিক্ষা পদ্ধতি’ গ্রন্থটি টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ও প্রকাশিত হয়। মৃত্যু : ঢাকা, ১১ এপ্রিল ১৯৭৩। ১৯৮৬ সালে তিনি একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত হন।