রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহৃদয়তা ও দয়ার মাহাত্ম্য


রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহৃদয়তা ও দয়ার মাহাত্ম্য
সহৃদয়তা ও দয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গুণ। আরবী ভাষায় এতদুভয়ের প্রতিশব্দ আমরা রিফ্ক এবং লুতফকে অবলম্বন করতে পারি। বস্তুত এ দুয়ের অর্থ হচ্ছে ব্যবহারিক জীবনে কাজকর্মে কঠোরতার পরিবর্তে সহৃদয়তা ও ন¤্রতা অবলম্বন করা। ইমাম রাগেব ইস্পাহানী লতিফ শব্দটির অনেকগুলো অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে পরম করুণাময় স্বীয় বান্দাদের পথনির্দেশনা ও হেদায়েতের প্রাক্কালে নমনীয়তা, সহৃদয়তা ও দয়া প্রদর্শন করেন। ইমাম বায়হাকী কিতাবুল আসমা ও ছিফাত অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, আল্লাহর নাম লতিফ তা এজন্য যে, তিনি স্বীয় বান্দাদের মঙ্গল ও সহায়তা প্রদর্শন করেন এবং তাদের জন্য মুক্তি, সফলতা ও পুণ্যার্জনের উপকরণসমূহ অকাতরে দান করেন। তিনি লতিফ এ জন্য যে, তিনি স্বীয় বান্দাদের মঙ্গল সাধন করেন এবং তাদের প্রতি এমন দয়া প্রদর্শন করেন যে, তারা ঘূণাক্ষরে তা জানতে পারে না। একই সাথে তিনি তাদের আবশ্যিক ও উপাদেয় বস্তুরাজি সরবরাহ করেন, যা তারা কল্পনাও করতে পারে না। ইবনুল আরাবীর কথা হলা এই যে, তিনিই লতিফ গুণের অধিকারী, যিনি তোমাদের প্রয়োজনসমূহ অত্যন্ত সহজভাবে পরিপূরণের পথ সুগম করে দেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেছেন যে, লতিফ গুণটির অধিকারী হওয়ার গৌরব তিনিই করতে পারেন, যিনি সূক্ষ্ম ও অচিন্ত্যনীয় প্রয়োজন এবং মুছলেহাত সম্পর্কে পরিজ্ঞাত আছেন। কিন্তু তিনি এই জ্ঞানবত্তা খুবই ন¤্রতা ও সহনশীলতার সাথে প্রয়োগ করেন, কঠোরতার দ্বারা নয়। তাই লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে, কাজ-কর্ম ও ব্যবহারে নরমী ও সহৃদয়তার ছোঁয়াচ পাওয়া গেলেই লতিফ শব্দের ব্যবহার সার্থকরূপ ধারণ করে। আর এই গুণটির পরিপূর্ণতা আমরা আল্লাহপাকের মাঝে সার্বিকভাবে অবলোকন করি। কুরআনপাকে আল্লাহ বহুবার নিজেকে লতিফ হিসেবে বিশেষিত করেছেন। হাদিস শরীফে আছে, তিনি নিজেকে রফিক হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন। কুরআনপাকে কোনো এক আয়াতের মর্মে বোঝা যায় যে, আল্লাহপাকের দয়া ও সহৃদয়তা মুমিন এবং কাফির উভয় শ্রেণিকেই তিনি সমভাবে রিযিক প্রদান করেন। অন্য আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘সুতরাং আল্লাহর রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি সহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কঠিন হৃদয় ও তাদের প্রতি রুক্ষ হতে তাহলে এমন লোক তোমার নিকট থেকে দৌড়ে দূরে সরে পড়ত।’ এ কারণে দয়া সহৃদয়তা একজন পয়গম্বরের জন্য একটি বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ গুণÑ যেন মানুষের মাঝে এর শিক্ষার বিস্তার ঘটানো যায় এবং মানুষকে এদিকে অনুপ্রাণিত করা যায়। আর এ জন্যই রহমতে আলম (সা.)-এর পবিত্র সত্তার মাঝে এই গুণটি বিশেষভাবে আমানত রাখা হয়েছিল। এমনকি স্বয়ং আল্লাহপাকও এ গুণটিকে নিজের খাছ রহমতের ফলশ্রুতি বলে সাব্যস্ত করেছেন। মূলকথা হচ্ছে সহৃদয়তা, দয়া, ক্ষমা, অনুকম্পা, সচ্চরিত্রতা প্রভৃতি নৈতিক গুণাবলি-সঞ্জাত সৌরভের নাম। যার মাঝে নির্মলতা, স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্যের অভিব্যক্তি পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছ যে, রাসূলেপাক (সা.) বলেছেন, আল্লাহপাক মহান ও বিনয়ী চরিত্রের অধিকারী। তিনি ন¤্রতা ও বিনয় অত্যন্ত পছন্দ করেন। হযরত জারীর বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসূলেপাক (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বিনয় ও ন¤্রতা থেকে বঞ্চিত সে সব কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত। তিনি আরো বলেছেন, তিনটি স্বভাব যার মাঝে পাওয়া যাবে আল্লাহপাক স্বীয় ছায়া তার ওপর বিস্তার করবেন এবং তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন। স্বভাবত্রয় হলো- দুর্বলের সাথে ন¤্র ব্যবহার করা এবং ক্রীতদাস-দাসীদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করা। একবার ইহুদিদের একটি দল রাসূলেপাক (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে সালাম জানানোর ক্ষেত্রে বলল, ‘আসসামু আলাইকুম’ অর্থাৎ তুমি মৃত্যুমুখে পতিত হও। হযরত আয়েশা (রা.) তাদের এই কটূক্তি শুনে প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সামু আল্লানাতু’ অর্থাৎ তোমরা মৃত্যুমুখে পতিত হও এবং তোমাদের ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। রাসূলেপাক (সা.) একথা শুনে বললেন, হে আয়েশা! চুপ করো, আল্লাহপাক সবকাজে ন¤্রতাকে পছন্দ করেন। শরীয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা করা এবং জামাতের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বনের অবকাশ আছে। কিন্তু তা শুধু তখন অবলম্বন করতে হবে, যখন মানুষ সীমা লঙ্ঘনের দায়ে চরমভাবে অভিযুক্ত হয়। কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা ভেঙে-চুড়ে নস্যাৎ করার প্রয়াস পায়। এক্ষেত্রে আল্লাহপাক অবশ্যই জিহাদ এবং কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলেপাক (সা.)-এর এক অভ্যাস ছিল, তিনি সাহাবীদের লক্ষ করে প্রায়শ বলতেন, তোমরা আসানী অবলম্বন করো, কঠোরতা অবলম্বন করো না। হাদিসের ভাষ্যকারগণ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, নফল এবং মুবাহ সংক্রান্ত বিষয়াদিতে যেন কঠোরতা অবলম্বন না করা হয়। কিন্তু শরীয়ত যে শক্তি আরোপের বিধান রেখেছে সেখানে যেন দুর্বলতার আশ্রয় না নেয়া না হয়।