শ্রীনগর ভূমিকম্প ও আমাদের প্রস্তুতি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
৫ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৫৭ মিনিটে সৃষ্ট ভূমিকম্পের উৎসস্থল ইউএসজির হিসাবমতে মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার দয়াহাটা ইউনিয়নে। এর মাত্রা রিখটার স্কেলে ৪.৩, যা মৃদু ভূমিকম্প। ৪-৫ মাত্রার মাঝামাঝি ভূমিকম্পগুলো মৃদু ভূমিকম্প।
পৃথিবীতে প্রতিবছর ৪-৫ মাত্রার ওপর গড়ে প্রায় পনেরো হাজারের বেশি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ২০২২ সালে পৃথিবীতে এই মাত্রার প্রায় চৌদ্দ হাজারের বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। ২০২০ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ৪-৫ মাত্রার ৩০টি ভূমিকম্প হয়েছে।
ভূমিকম্প বোঝাতে আমরা মাত্রা ও তীব্রতা সমান্তরালে বুঝিয়ে থাকি। মাত্রা বোঝায় উৎসস্থল থেকে কি পরিমাণ শক্তি ভূ-পৃষ্ঠে বের হয়ে আসে। যেমন : ৬ মাত্রার ভূমিকম্প বলতে বোঝায় হিরোশিমার একটি অ্যাটমিক পারমাণবিক বোমার সমতুল্য শক্তি। তীব্রতা বোঝায় মানুষ কিংবা যে কোনো স্থাপনা কি ধরনের কম্পন অনুভব করেছে।
শ্রীনগরে ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল রোমান স্কেলে iii-v এর মধ্যে। মডিফাইড মার্কেলি স্কেলের মাধ্যমে তীব্রতা বোঝানো হয়। ‘iii’ তীব্রতা অর্থাৎ বহু মানুষ কম্পন অনুভব করেছেন, কিন্তু ভূমিকম্প কিনা তা বুঝে উঠতে পারেননি। ‘v’ তীব্রতা বলতে বোঝায় বহু মানুষ কম্পনের কারণে ঘুম থেকে উঠে গেছেন। তীব্রতা যত বেশি হবে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি তত বেশি হবে। ক্ষয়ক্ষতির ওপর নির্ভর করে তীব্রতা পরিমাপ করা যায়। প্রতিটি ভূমিকম্পের একটি মাত্রা থাকে এবং ১২ ধরনের তীব্রতা থাকতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে উৎসস্থলের কাছাকাছি ‘xii’ তীব্রতা অনুভূত হয়, অর্থাৎ সব স্থাপনা এই স্থানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
অনেকের প্রশ্ন শ্রীনগরে সংঘটিত এ ভূমিকম্প কোনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কিনা। এই ভূমিকম্পটির উৎসস্থল শ্রীনগরের বড় খাল কিংবা মরিচাবাড়ী খাল হতে পারে। সাধারণত ভূমিকম্পপ্রবণ কোনো অঞ্চলের সরু লম্বালম্বি ছোট নদী ও খালগুলো ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বড় খাল কিংবা মরিচাবাড়ী খাল এরকম একটি ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা। নরম পলিমাটি অঞ্চলের এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা বড় ভূমিকম্প সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে না। এমন ফাটলরেখা ছোট ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে।
ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় এই ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে নিওটেকটনিক প্রক্রিয়া বলা হয়। নিওটেকটনিক প্রক্রিয়ার অংশ শ্রীনগর ভূমিকম্প। বাংলাদেশের পললভূমি অঞ্চল অসংখ্য ছোট নদী বা খাল নিওটেকটনিক প্রক্রিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই নিওটেকটনিক প্রক্রিয়া ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তাকে বোঝায়। ভূতাত্ত্বিকভাবে ইন্ডিয়ান প্লেটের অংশ হিসাবে বাংলাদেশ যে নিওটেকটনিক ফাটলরেখা বা চ্যুতির সক্রিয়তায় রয়েছে, এই শ্রীনগর ভূমিকম্প তার প্রমাণ।
যদিও ঢাকার আশপাশের এলাকায় বড় ভূমিকম্প হওয়ার মতো ফাটলরেখা বা প্লেট বাউন্ডারি নেই, কিন্তু ভূতাত্ত্বিক প্লেটের সম্প্রসারণশীলতা প্রমাণ করে যে, বড় ফাটলরেখাগুলো ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করছে। বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ইন্ডিয়ান প্লেট ৫ সেন্টিমিটার/বছর বেগে উত্তর-পূর্বদিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে বার্মিজ প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেট পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিকে ধাবিত হওয়ার কারণে যে ভূগাঠনিক অবস্থান এই অঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে তা তুরস্ক অঞ্চলের আনাতোলিয়া প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং আরব প্লেটের অনুরূপ।
তুরস্ক ও সিরিয়ায় এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুরূপ ভূতাত্ত্বিক অবকাঠামোতে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে, যার ফলে এই অঞ্চলে মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। এই ভূমিকম্পে প্রায় ষাট হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। প্রায় ১১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় তুরস্ক।
বাংলাদেশে মুখ্য ভূতাত্ত্বিক ফল্ট বা ফাটলরেখা বলতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডাওকি ফল্ট, পূর্ব অঞ্চলের পূর্বাঞ্চলীয় প্লেট বাউন্ডারি এবং মধ্য অঞ্চলের মধুপুর ফল্টকে বুঝায়। এই ফাটলরেখাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সক্রিয় হয়েছিল। ১৮৯৭ সালে ডাওকি ফল্ট থেকে ৮.৩ মাত্রায় ভূমিকম্প হয়, যা গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে পূর্বাঞ্চলীয় প্লেট বাউন্ডারি ফাটলের একটি অংশ থেকে ৭.০ মাত্রার ওপর একটি ভূমিকম্প হয়। ১৮৮৫ সালে মধুপুর ফাটলরেখা থেকে ৭.০ মাত্রার ওপর ভূমিকম্প হয়। জাপানের ড. মেরিনো মিসিতো এবং আমি এই ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখাগুলোর চরিত্র ও কতদিন পর এই ফাটলরেখাগুলো থেকে পরবর্তী ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে তা নিয়ে গবেষণা করেছি। আমরা দেখেছি ডাউকি এবং মধুপুর ফাটল রেখা/চ্যুতিতে পরবর্তীতে বড় ভূমিকম্প হওয়ার জন্য ৩৫০-৫০০ এবং ২০০০ বছরের প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে আমি ও ক্যালিফোর্নিয়ার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ক্যারি সিহ শ্রীমঙ্গলে ভূমিকম্পের পুনঃসংঘটিত হওয়ার সময়কাল নির্ধারণ করেছি, যা প্রায় ৭০০ বছর। এই তিনটি বড় ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা ব্যতীত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১২টি ফাটলরেখা রয়েছে। যেগুলো থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে। এই ফাটলরেখা অঞ্চল হলো-সেন্টমার্টিন দ্বীপ, দক্ষিণ নীলা দ্বীপ, মহেশখালী, জালদি, পটিয়া, সন্দ্বীপ, লালমাই, হবিগঞ্জ, সিলেট, ফেঞ্চুগঞ্জ, হারারগঞ্জ, পাথারিয়া। এই ফাটলগুলোর মধ্যে মহেশখালীতে ১৯৯৯ সালে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। অন্য ফাটলগুলো থেকে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখার দৈর্ঘ্য এবং সক্রিয়তা বিবেচনায় এগুলো থেকে ৬-৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে এবং ভূমিকম্প সংঘটিত বা পুনঃসংঘটিত হওয়ার সময়কাল ২৫০ থেকে ১১০০ বছর হতে পারে। ভূমিকম্পের এই সব পুনঃসংঘটিত হওয়ার সময়কাল বলতে এটা বোঝায় না যে, আমাদের হিসাব মতো দিনক্ষণ মেপে ভূমিকম্প সংঘটিত হবে। ভূমিকম্প প্রবণ কোনো একটি অঞ্চলে যে কোনো সময়ে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হতে পারে। জাপানের কোবে এবং চায়নার সিচুয়ান ভূমিকম্প তার প্রমাণ। আমাদের গবেষণা কাজও সম্পন্ন হয়নি, মাঠপর্যায়ে আরও সবিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
এসব বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ মাঝারি ভূকম্পনপ্রবণ দেশ। মাঝারি হওয়ার কারণ হলো জাপান, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড, তুরস্ক, নেপাল, উত্তর ভারতের মতো বড় ভূমিকম্প ঘন ঘন বাংলাদেশে সংঘটিত হয় না। এজন্য ভূমিকম্পের প্রস্তুতিও বাংলাদেশে কম। হাইতিও বাংলাদেশের মতো মাঝারি ভূমিকম্পের দেশ। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে সংঘটিত ভূমিকম্পে এ দেশে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। মূলত ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসে প্রস্তুতির অভাবে এত বেশি জীবনহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বাংলাদেশ বন্যা ও সাইক্লোন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বা নেতৃত্বের আসনে থাকলেও ভূমিকম্প দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে প্রায় অপ্রস্তুত।
অন্যদিকে নগরের ভবন ও লাইফলাইন কাঠামোগুলো বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সচেতনতা ক্ষীণ। বলা হয়, ঢাকা শহরে প্রায় ৮৫ ভাগ অবকাঠামো বিশেষ করে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে গড়ে তোলা হয়নি। এমতাবস্থায়, ভূমিকম্প নামক শহর-দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে হলে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন/অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।
অন্যদিকে প্রধান সাড়া প্রদানকারী সংস্থাগুলোর উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজে শক্তি বাড়ানোর জন্য দক্ষতা সৃষ্টি করতে হবে। এই সাড়া প্রদানকারী সংস্থাগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, হেলথ ডিরেক্টরেট, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, গ্যাস কোম্পানি, বিদ্যুৎ সংস্থা, পুলিশ বাহিনী ইত্যাদি। ইতোমধ্যে সরকার ভূমিকম্প দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে বেশকিছু পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দ্রুততম সময়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার এখনই উপযুক্ত সময়।
অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল : উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
