বঙ্গবাজারের চেয়েও ঝুঁকিতে রিয়াজউদ্দিন বাজার


বঙ্গবাজারের চেয়েও ঝুঁকিতে রিয়াজউদ্দিন বাজার
বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরীর চট্টগ্রামের নিউমার্কেট সংলগ্ন রিয়াজউদ্দিন বাজারে ছোট-বড় দুই শতাধিক মার্কেট এবং অন্তত ১০ হাজার দোকানপাট রয়েছে। এই মার্কেটে দোকানপাটের পাশাপাশি রয়েছে হাজারো মানুষের আবাসও। কিন্তু এখানে কোনো কারণে অগ্নিকাণ্ড হলে নির্বাপণের মতো নেই নিজস্ব কোনো পানির উৎস। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ভালো নয়। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো নেই কোনো গলি কিংবা চলাচলের পথ। মার্কেটটি এতটাই ঘিঞ্জি যে, ক্রেতা-বিক্রেতাদেরই ঠেলাঠেলি করে চলাচল করতে হয়। কয়েক দিন আগে মার্কেটটি পরিদর্শন করে এমনই চিত্র পেয়েছে ফায়ার সার্ভিসের একটি জরিপকারী দল। এ অবস্থায় কোনো কারণে রিয়াজউদ্দিন বাজারে আগুন লাগলে ঢাকার বঙ্গবাজারের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রিয়াজউদ্দিন বাজারের রাস্তার আরেক পাশে রয়েছে চট্টগ্রাম জহুর হকার্স মার্কেট। এই মার্কেটে রয়েছে প্রায় সোয়া এক হাজার বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর ভোররাতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এই মার্কেটে। ভোরে হওয়ায় মার্কেটে কোনো লোকজন ছিল না। ফলে তেমন কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও পুড়ে গেছে মার্কেটের শতাধিক দোকানপাট। এই মার্কেটের আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশে থাকা জালালাবাদ মার্কেটেও। সেই মার্কেটেরও বেশ কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর এই মার্কেটের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দেখতে একযোগে অভিযান চালান তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সরেজমিন পরিদর্শনকালে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না দেখে হতবাক হন তাঁরা। মার্কেটের ফায়ার অ্যাসেম্বলি এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে গাড়ির পার্কিং। ফলে মার্কেটটিকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সর্বশেষ মার্কেটটিতে জরিপ চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের আরেকটি টিম। অগ্নিনির্বাপণের তেমন কোনো ব্যবস্থা না দেখে হতবাক হয়েছেন তাঁরাও। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু রিয়াজউদ্দিন বাজার কিংবা জহুর হকার্স মার্কেট নয়, তামাকুমণ্ডি মার্কেট, হকার্স মার্কেট, টেরিবাজারসহ অন্তত ৪১টি মার্কেট ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এসব মার্কেটকে বিভিন্ন সময় ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলা হলেও এ নিয়ে যেন তাদের কোনো দায় নেই। শুধু মার্কেট নয়, বিভিন্ন কলকারখানা, বহুতল আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছর ধরে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। তাতে দেখা যায়, ঢাকার পাশাপাশি বড় ধরনের অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রামও। ঢাকার ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং চট্টগ্রামে ৫৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। তথ্য মতে, চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১ হাজার ৬৭৬টি ভবন পরিদর্শন করে ৯১০টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস। এই নগরীতে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ধরনের ৪৬৩টি ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ৪৪৭টি। পরিকল্পিত চট্টগ্রামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরী অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। যে যেভাবে পেরেছে মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রশস্ত চলাচলের পথ রাখা হয়নি। পানির উৎসগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ফলে এখন অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো অনিবার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু এভাবে মার্কেট গড়ে ওঠার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর– কেউ নিচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আবদুল মালেক (চলতি দায়িত্ব) বিভিন্ন মার্কেটে সরেজমিন পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, চট্টগ্রামের বড় মার্কেটগুলো এতই ঘিঞ্জি যে, সেখানে গাড়ি ঢুকতে পারে না। মার্কেটগুলোতে নিজস্ব পানি জোগানের ব্যবস্থা নেই। অনেক মার্কেটে শত শত লোকও বসবাস করে। অথচ এভাবে মার্কেটে লোকজনের বসবাসের কথা নয়। অনেক মার্কেটে হোটেল রয়েছে। হোটেলে রান্না করা হয়। বিদ্যুতের ব্যবস্থাও ভালো নয়। ফলে এমন কোনো মার্কেটে আগুন লাগলে কী হতে পারে, তা সহজে অনুমান করা যায়। এ জন্য মার্কেটগুলোতে আমরা গিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছি। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক এমডি আবদুল মালেক বলেন, চট্টগ্রামের কলকারখানা, মার্কেট, বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমাদের টিম রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন কলকারখানা পরিদর্শন করেছে। মার্কেটগুলোতে অগ্নিপ্রতিরোধের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলে এসব মার্কেটে আগুন লাগলে অবস্থা হবে ভয়াবহ।