সরকারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে দেশের আইনসভা বা জাতীয় সংসদ। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সংসদের প্রধান কাজ হলেও রাষ্ট্রের এই দুই অঙ্গের কার্যক্রম এখন আর কার্যত আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমছে। ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সংসদের কার্যক্রমে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাবে, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সংসদে পেশায় সরাসরি ব্যবসায়ী এমন এমপি ছিলেন ১৭ দশমিক শূন্য ৫ ভাগ। বর্তমান সংসদে পেশাদার ব্যবসায়ী এমপি হলেন ৬১ দশমিক ৭৩ ভাগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামরিক শাসনের কালো অধ্যায় পেরিয়ে ১৯৯০ সালের পর থেকে ওয়ান-ইলেভেনের দুই বছর বাদে দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংসদীয় রাজনীতি চালু রয়েছে। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তা বেশিরভাগ সময় পালন করতে দেখা যায়নি। ১১টি সংসদে অর্ধেকের বেশি সময় বিরোধী দল ছিল নামকাওয়াস্তে। বাকি সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যখনই বিরোধী দলে ছিল, তখনই তারা সংসদ বর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। ফলে জনগণের মনোযোগ হারিয়ে গেছে সংসদের কার্যক্রম থেকে।
১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম সংসদের প্রথম দিনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এই সংসদের মর্যাদা যাতে রক্ষা পায়, সেদিকে আপনি (স্পিকার) খেয়াল রাখবেন। কারণ, আমরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি, সে ইতিহাসে যেন খুঁত না থাকে। দুনিয়ার পার্লামেন্টারি কনভেনশনে যেসব নীতিমালা আছে, সেগুলো আমরা মেনে চলতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে যেন এমন একটি পার্লামেন্টারি প্রসিডিউর ফলো করতে পারি, যাতে দুনিয়া আমাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।’
প্রথম সংসদের সদস্য ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সঙ্গে আলাপকালে বলেন, সংসদীয় রাজনীতির সৌন্দর্য হলো বিতর্ক। কিন্তু সংসদে এখন আর বিতর্ক হতে দেখা যায় না। ফলে সংসদীয় রাজনীতির সুফল থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারগুলোর অতিমাত্রায় আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যত মেকানিজম থাকা দরকার, সবই বর্তমান সংসদে কার্যকর রয়েছে। তারপরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অতীতেও কার্যকর বিরোধী দল ছিল না, বর্তমানেও প্রকৃত বিরোধী দল সংসদে নেই।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে সংসদীয় রাজনীতির সুফল জনগণ পাবে না। সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ মন্ত্রীর পরিবর্তে সদস্যদের করা একটা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তারপরও মন্ত্রণালয়ের কাজের জবাবদিহি সংসদীয় কমিটিগুলো নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে সরকার ও আইনসভাকে আলাদা করা দুষ্কর হয়ে পড়ছে।
সংসদীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য : সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সংসদীয় রাজনীতি চালুর পরে সবচেয়ে কার্যকর সংসদ ধরা হয় পঞ্চম সংসদকে (১৯৯১-৯৫)। ওই সংসদে সরকারি দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে তা ভোটাভুটিতে নিষ্পত্তি হয়। ৫০ বছরের সংসদীয় রাজনীতিতে এ ঘটনা একবারই ঘটেছে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের সেচমন্ত্রী মাজিদুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ। ওই অভিযোগ তদন্তে সমানসংখ্যক সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যদের সমন্বয়ে সংসদীয় কমিটি গঠন করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া সংসদের বৈঠক মুলতবি রেখে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে পাঁচটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এর পরে আর কোনো সংসদে মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণের নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিন্তু পঞ্চম সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশন চলাকালে ১৯৯৪ সালের ১ মার্চ তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধীদলীয় সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। এই ওয়াকআউট অধিবেশন বর্জনে পরিণত হয়। ২৮ ডিসেম্বর বিরোধীদলীয় সদস্যরা পদত্যাগ করেন।
পঞ্চম সংসদে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল– মেহেরপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দল ছাত্রের বন্দুকযুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতি, পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান নির্বাচিত করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র হামলায় একজন নিহত ও দুই শতাধিক ছাত্র আহত হওয়া, উত্তরাঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য পরিস্থিতি। সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম মুলতবি করে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ষষ্ঠ সংসদ। এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র চার কার্যদিবস। এই সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সপ্তম সংসদ প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে সমর্থ হয়। এই সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ১৫৬ কার্যদিবস সংসদ বর্জন করে। এই সংসদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল– জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি শিল্পনীতি ও বেসরকারীকরণ নীতি প্রণয়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জাতীয় বিদ্যুৎ নীতি, সড়ক দুর্ঘটনা, নারায়ণগঞ্জে বোমা হামলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, শেয়ারবাজার, ট্রানজিট ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং জাতীয় সংগীতের প্যারোডি।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত অষ্টম সংসদের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ১৩০ কার্যদিবস সংসদ বর্জন করে। এই সংসদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল– বিরোধীদলীয় নেতা কর্তৃক ‘জিয়াউর রহমানের মাজারে লাশ নেই’ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে গঠিত হয় নবম সংসদ। এই সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বজায় রাখে। এই সংসদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্যে রয়েছে– বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের লক্ষ্যে আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগে সংসদে বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে ধন্যবাদ জানানো, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে অভাবিত সাফল্যের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক দেওয়া পদকপ্রাপ্তিতে জনগণ ও সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানানো।
২০১৪ থেকে পরপর দশম ও একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। দশম সংসদে বিএনপির উপস্থিতি না থাকলেও একাদশ সংসদে তাদের মাত্র সাতজন সদস্য ছিলেন। কিন্তু তাঁরাও সম্প্রতি পদত্যাগ করায় সংসদ এখন বিএনপিশূন্য।
সংসদ আছে : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, দীর্ঘ সামরিক শাসনের থাবা এড়িয়ে সংসদীয় রাজনীতি যে এখনও চালু রয়েছে– এটাই বড় পাওয়া। সংসদীয় কার্যক্রমের অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিন্তু কোরাম সংকট, আইন প্রণয়নের কার্যক্রমে সদস্যদের অনীহা, সংসদ বর্জনের মতো নেতিবাচক উদাহরণও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বাড়ছে। তাঁরা এমপিও হচ্ছেন। সংসদীয় কমিটিতে গিয়ে এসব সদস্য ব্যবসায়িক স্বার্থ উপেক্ষা করতে পারছেন না। অন্যদিকে বিরোধী দলের সক্রিয় অনুপস্থিতি সংসদকে সব সময় ভুগিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুরোটাই ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় বিরোধী দলের সদস্য হয়েও রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হলো সংসদ। সরকারি দল ও বিরোধী দলের উপস্থিতির পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে সংসদ সমৃদ্ধ হয়। এতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনও ঘটে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন সভার ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, সংসদীয় কমিটিগুলো পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। তারা নিয়মিত বৈঠক করছে। আর জবাবদিহি একেবারেই নিশ্চিত করা যায়নি বলে যা বলা হচ্ছে, তা মোটেই সত্য নয়। তিনি পরপর তিন মেয়াদে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণেই রাজপথে উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা, গাড়ি ভাঙচুর ও হরতালের বিষয়গুলো সেভাবে অনুভূত হয়নি। ফলে দেশের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়শীল দেশের কাতারে। দেশ উন্নীত হয়েছে।