ভোটের নায়ক কাউন্সিলররাই

প্রকাশিতঃ জুন ১৪, ২০২৩ | ৭:১১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

বিএনপিবিহীন খুলনা ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটের হার খুলনায় ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং বরিশালে ৫১ দশমিক ৪৬ ভাগ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকায় মেয়র পদে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত বলে অনেকে আগ থেকেই ধরে নিয়েছেন। তাই মেয়র নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল কম। তবে ব্যতিক্রম ছিল কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে। প্রতিটি ওয়ার্ডেই ছিল একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী। মূলত তারা নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে নির্বাচনের দিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। সবকিছু বিবেচনায় দুই সিটিতে বিপুলসংখ্যক ভোটার কেন্দ্রে আনার পেছনে মূল নায়ক ছিলেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। খোকন ১২৬ কেন্দ্রেই প্রথম হয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ৮৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন খোকন সেরনিয়াবাত। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২৬ কেন্দ্রের সবকটিতেই প্রথম হয়েছেন তিনি। কেবল প্রথমই নয়, তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখার ফয়জুল করীমের চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন। নিজের ওয়ার্ড ২৪ নম্বরেও নৌকার চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছেন ফয়জুল। একই ঘটনা ঘটেছে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসের ক্ষেত্রে। নিজের ওয়ার্ড ২১ নম্বরে নৌকা এবং হাতপাখার চেয়ে পেয়েছেন কম ভোট। সিটিতে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৬টি। তবে মেয়র পদের চেয়ে কাউন্সিলর পদে ভোট নিয়ে বেশি আগ্রহ ছিল ভোটারদের। বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিজয়ী এবং বিজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এতটাই বেশি যে, এখানে আসলে ভোটের বিশ্লেষণ করে কোনো লাভ নেই। তাছাড়া ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি যেখানে নির্বাচনে নেই সেখানে ফলাফল এমন হওয়াই স্বাভাবিক। বিএনপি নির্বাচনে থাকলে হয়তো হিসাবটা অন্যরকম হতো।’ নৌকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য বরিশাল আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. লস্কর নূরুল হক বলেন, ‘বরিশালের মানুষ একটা পরিবর্তন চাইছিল। সেই সঙ্গে চাইছিল উন্নয়ন। খোকন সেরনিয়াবাতের জন্য তাই একটা গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়। যার প্রতিফলন এই বিজয়। নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, বিএনপির লোকজনও এবার নৌকায় ভোট দিয়েছে।’ তবে ফলাফল ঘোষণার প্রায় ২০ ঘণ্টা পরও নতুন মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতকে শুভেচ্ছা জানাতে যায়নি হাসানাত আব্দুল্লাহ অনুসারী আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কেউ। সবাই যেখানে তার বাসায় গিয়ে জানাচ্ছে শুভেচ্ছা সেখানে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন মহানগরের সভাপতি-সম্পাদক। নির্বাচনি অফিসে গিয়েও তার সঙ্গে দেখা করেনি এই গ্রুপের কোনো নেতা। হাসানাত পক্ষের কেউ না গেলেও সোমবার রাত থেকেই শুভেচ্ছায় ভাসছেন নির্বাচিত নয়া মেয়র। স্থানীয় রাজনীতিতে হাসানাতবিরোধী হিসাবে পরিচিত প্রায় সবাই যাচ্ছেন তার কাছে। খোকনও দেখা করেছেন ১৪ দলের সমন্বয়ক আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামিমের সঙ্গে। এদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ১৮ কাউন্সিলর প্রার্থীর ৯ জন জয় পেয়েছেন। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা বহিষ্কৃত রুপন পেয়েছেন ৭ হাজার ৯৯৯ ভোট। বিজয়ী কাউন্সিলরদের মধ্যে ১৯ জন মেয়র সাদিকের অনুসারী। ৭ জন খোকন সেরনিয়াবাতের। জামায়াতের ৪ জন নির্বাচন করলেও জয়ী হয়েছেন একজন। এছাড়া ২ জন আছেন তারা কোন পক্ষের তা এখনো নিশ্চিত নয়। সোমবার নির্বাচন শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সবাই বুঝে ফেলে যে, বিশাল ব্যবধানে জিততে চলেছে নৌকা। এর পরপরই আওয়ামী লীগের উল্লসিত নেতাকর্মীদের ঢল নামে প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের আলেকান্দার বাসায়। অনেকে ছুটে যান সদর রোডে নৌকার প্রধান নির্বাচনি কার্যালয়ে। নগরজুড়ে শুরু হয় ঢোল-বাদ্য নিয়ে আনন্দ উল্লাস, মিষ্টি বিতরণ। রাত সোয়া ৯টায় ঘোষিত চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৫৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে জয়ী হয়েছে নৌকা। এর পরপরই তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, সংসদ-সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ, কেন্দ্রীয় নেতা বলরাম পোদ্দার ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুভাষ হালদারসহ অন্য নেতারা। রাত থেকে শুরু হওয়া এই শুভেচ্ছা জ্ঞাপন চলছে এখনো। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এভাবে অভিনন্দন জানালেও খোকনের কাছে যাননি হাসানাত অনুসারী কেউ। সোমবার রাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে খোকনকে অভিনন্দন জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন মহানগর সভাপতি জেলা চেয়ারম্যান অ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীর ও সাধারণ সম্পাদক মেয়র সাদিক। বরিশালে থাকলেও খোকনের কাছে যাননি জাহাঙ্গীর। নৌকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর আমিন উদ্দিন মোহন বলেন, ‘তারা বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। নৌকা হারানোর সব রকম চেষ্টাই তো তারা করেছে গোপনে। তারপরও যখন হারাতে পারেনি। এ কারণে হয়তো লজ্জায় পড়ে অভিনন্দন জানাতে পারছে না।’ নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তাৎক্ষণিক শুভেচ্ছা জানিয়েছি আমরা। তাছাড়া তাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।’ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিসিসি নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ায় ১৯ জনকে আজীবন বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। সোমবার ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর দেখা যায় এদের মধ্যে ৯ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এরা হলেন ৩নং ওয়ার্ডে হাবিবুর রহমান ফারুক, ৮নং ওয়ার্ডে সেলিম হাওলাদার, ৯নং ওয়ার্ডে সৈয়দ হুমায়ুন কবির, ১৮নং ওয়ার্ডে জিয়াউল হক মাসুম, ২৪নং ওয়ার্ডে ফিরোজ আহম্মেদ, ২৮নং ওয়ার্ডে হুমায়ুন কবির এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সেলিনা বেগম, রাশিদা পারভিন ও মজিদা বোরহান। মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা সাবেক মেয়র কামালের পুত্র রুপন বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে পেয়েছেন ৮০ হাজার কম ভোট। জামায়াতের ৪ জন এবার কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ২৭নং ওয়ার্ডের মনিরুজ্জামান ছাড়া বাকি ৩ জন জয় পাননি। নির্বাচনে মেয়র সাদিকপন্থি ১৯ জন কাউন্সিলর জয়ী হয়েছেন। এরা হলেন ২নং ওয়ার্ডে আরিফুর রহমান মুন্না, ৪নং ওয়ার্ডে সৈয়দ আবিদুর রহমান, ৫ নম্বরে কেফায়েত হোসেন রনি, ৬ নম্বরে খান মো. জামাল হোসেন, ৭ নম্বরে অ্যাড. রফিকুল ইসলাম খোকন, ১১ নম্বরে মজিবর রহমান, ১২ নম্বরে আনোয়ার হোসেন রয়েল, ১৩ নম্বরে মেহেদী পারভেজ খান, ১৪ নম্বরে শফিকুল ইসলাম পলাশ, ১৭ নম্বরে গাজী আক্তারুজ্জামান হিরু, ১৯ নম্বরে নঈমুল ইসলাম খান লিটু, ২১ নম্বরে শেখ সাঈয়েদ আহম্মেদ মান্না, ২৯ নম্বরে ইমরান মোল্লা ও ৩০ নম্বরে খাইরুল শাহিন। এছাড়া সংরক্ষিত ১০টি ওয়ার্ডের ৫টিতে জিতেছে সাদিকপন্থি মহিলা কাউন্সিলররা। কাউন্সিলর তালিকায় নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারী রয়েছে ৯ জন। এরা হলেন ১০ নম্বরে জয়নাল আবেদীন, ১৬ নম্বরে শাহিন সিকদার, ২০ নম্বরে জিয়াউর রহমান বিপ্লব, ২৩ নম্বরে এনামুল হক বাহার, ২২ নম্বরে আনিছুর রহমান দুলাল, ২৫ নম্বরে সুলতান মাহমুদ এবং ২৬ নম্বরে হুমায়ুন কবির। সংরক্ষিত আসনের যে দুজন খোকন সেরনিয়াবাতের অনুসারী তারা হলেন কহিনুর বেগম ও নূর নেহার বেগম। নির্বাচিত বাকি ২ কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের বলে চিহ্নিত নন। সব সমীকরণে সাফল্য দেখছে আ.লীগ খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় ও জাতীয় সব সমীকরণেই আওয়ামী লীগ সাফল্য পেয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বিএনপি অংশ না নেওয়ার পরও এ নির্বাচনে ৪৮.১৭ শতাংশ ভোট পড়ার হারও তাদের ‘প্রত্যাশা’র চেয়েও বেশি। সিটিতে ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৮২টিতে নৌকার প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বেশি ভোট পেয়েছেন। বাকি ৭টিতে তিনি হাতপাখা প্রতীকের মো. আব্দুল আউয়ালের চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। কেন্দ্রে ভোটার টানতে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন না দিয়ে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। ভোটের দিন পরিবেশ শান্ত রাখা, ভোট নিয়ে মানুষের অনীহা আছে-বিএনপির এমন প্রচার ব্যর্থ করে দেওয়াসহ দলীয় কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছিল। এর সবই খুলনা সিটির ভোটের ফলাফলে প্রতিফলন ঘটেছে। শুধু তাই নয়, বিএনপির বহিষ্কৃত ৯ ও জামায়াতের ৫ নেতাকর্মী কাউন্সিলর পদে ভোট করেছেন। তাদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের দুজন ছাড়া সবাই হেরে গেছেন। বাকি সব ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের অংশগ্রহণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়ার ঘটনাও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করছেন দলটির নেতারা। এদিকে নির্বাচনের ফলাফলে হতবাক স্থানীয় বিএনপি নেতারা। বিএনপির নেতাকর্মীদের কেন্দ্রে না যাওয়ার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-তার পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেনি। অনেক নেতাই পছন্দের কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্য গোপনে কাজ করেছেন। তাদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবুও ৪৮.১৭ শতাংশ ভোটের হার নিয়ে সংশয় আছে তাদের। দলটির নেতাদের ধারণা, সারা দিন ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে শেষ করার পর ফলাফলের কোনো একপর্যায়ে কারচুপি হয়েছে। তবে এর সঠিক কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বলা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হয়। কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়া অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জনের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৬ জন। এর মধ্যে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছেন এক লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট। এ নির্বাচনে পড়া ভোটের ৬০.৪১ শতাংশই তিনি পেয়েছেন। বাকি ২৯.৫৯ শতাংশ পেয়েছেন মেয়র পদের অন্য চার প্রার্থী। তাদের মধ্যে হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল আউয়াল ছাড়া বাকি তিন মেয়র প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এ ফলাফল বিএনপির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়-তা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। বিএনপি ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছিল। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রমাণ করেছে- নির্বাচন নিয়ে তাদের অনীহা নেই, তারা বিএনপির কথা শোনেনি। আওয়ামী লীগের উন্নয়মূলক কাজে তাদের সমর্থন রয়েছে। এসএম কামাল বলেন, মেয়র পদে আমাদের প্রার্থী জিতে যাবেন-এমন আগাম ধারণা থেকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী মাঠে সক্রিয় ছিলেন না। তারা সক্রিয় থাকলে আমাদের আরও ভোট বাড়ত। নির্বাচনের ফলাফলে সাধারণ মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিন। তিনি বলেন, এটা কোনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নয়। গণমাধ্যমের খবরে ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ভোট পড়ার যে সংখ্যা উল্লেখ করেছেন তা এলো কোত্থেকে? এই ফলাফল বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটা ইভিএমের একটা সূক্ষ্ম কারচুপি। তিনি বলেন, দলীয় পদধারী কোনো নেতাকর্মী ভোট দিতে যাননি। সমর্থকদের স্থানীয়ভাবে প্রভাবিত করে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করেও খুব একটা সাফল্য পায়নি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির কারণে এ নির্বাচন প্রেস্ট্রিজ ইস্যু হিসাবে নেয় আওয়ামী লীগ। এজন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ ছিল দলটির সামনে। কেন্দ্রীয়ভাবে ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় ঠিক করে দেওয়া হয়। এর একটি হচ্ছে-কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে কমবেশি ৫০ শতাংশ ভোটার উপস্থিত করার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। মেয়র পদে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করা এবং তালুকদার আব্দুল খালেকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বিবেচনায় এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি খুব কম হবে বলে শঙ্কা ছিল তাদের। ওই শঙ্কা থেকে কাউন্সিলর পদে দলের কাউকে মনোনয়ন দেয়নি দলটি। কাউন্সিলর পদ সব নেতাকর্মীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। এ সুযোগে প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক নেতাকর্মী প্রার্থী হয়েছেন। ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ১০ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর বেশিরভাগই দলীয় নেতাকর্মী। একইভাবে ১৮, ১৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ৮ জন ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ৭ জন করে কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যাদের বেশিরভাগই সরকারি দলের নেতাকর্মী। এছাড়া ৯টি ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও ৫টিতে জামায়াত নেতারা প্রার্থী হন। তাদের প্রচার-প্রচারণায় কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। ভোটের পরিবেশ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের এসব নেতাকর্মীর অভিযোগ ছিল না। দলীয় সরকারের অধীনে এমন পরিবেশ বজায় রাখাই বড় সফলতা বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। এছাড়া নির্বাচনে ৪৮.১৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে আসাও বড় জয় হিসাবে দেখছে। ভোটার কেন্দ্রে টানতে কাউন্সিলর পদে উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক কাজি আমিনুল হক বলেন, বিষয়টি সেরকম নয়। ভোটারারা নিজ থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে কেন্দ্রে গেছেন। তিনি বলেন, আমরা আরও বেশি ভোট পড়বে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু মেয়র কে হবেন তা অনেক ভোটার আগাম ধারণা করতে পারায় তারা কেন্দ্রে আসেননি। এছাড়া অনেকেই খুলনার বাইরে চাকরিস্থলে থাকায় তারাও আসেননি। এ কারণে ভোটের ফলাফল এমন হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এমন পাঁচ প্রার্থী বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের সঙ্গে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতারা যোগাযোগ রেখেছেন। সবাইকে বলা হয়েছে, যেভাবে হোক ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে হবে। কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়ানো যাবে না। কেউ সহিংসতায় জড়ালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেবে। বিএনপি-জামায়াতের ১৪ নেতাকর্মীর ১২ জনই হেরেছেন : খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির নয়জন ও জামায়াতের পাঁচজন কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র দুজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন-সংরক্ষিত-৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মাজেদা খাতুন। ১২ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর মো. শফিকুল আলম। বাকি সবাই হেরে গেছেন। হেরে যাওয়ার জন্য তারা ইভিএমকে দুষছেন। এ বিষয়ে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আশফাকুর রহমান কাকন বলেন, পরপর দুবার কাউন্সিলর ছিলাম। আমার জনপ্রিয়তা আছে। তাই দল থেকে বহিষ্কার হয়েও নির্বাচন করেছি। ভোটও সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু ইভিএমে কারসাজি করে আমাকে হারানো হয়েছে। তিনি বলেন, ফলাফল ঘোষণার সময়ে এ কারসাজি করা হয়। পাঁচ বছর আগে বিএনপির দলছুট কাউন্সিলররাও ধরাশায়ী : ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত ৮ জন তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তারা এখনো আওয়ামী লীগেই আছেন। এবার নির্বাচনে অংশও নেন তারা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে তাদের ৫ জনই হেরে গেছেন। বাকি তিনজন পুনরায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। হেরে যাওয়া কাউন্সিলর প্রার্থীরা হলেন-২ নম্বর ওয়ার্ডে মো. সাইফুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে মো. সুলতান মাহমুদ পিন্টু, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে মো. ডালিম হাওলাদার, ১২ নম্বর ওয়ার্ডে মো. মনিরুজ্জামান ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে আনিছুর রহমান বিশ্বাস। আর বিজয়ী হয়েছেন-৬ নম্বর ওয়ার্ডের শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ হাফিজুর রহমান হাফিজ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ মো. গাউছুল আজম। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে আসা কাউন্সিলরদের এ নির্বাচনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসাবে অখ্যায়িত করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে উঠে আসা এক বা একাধিক নেতা। এ কারণে প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী দলীয় নেতাদেরই ভোট দিয়েছেন। ফলে তাদের ওপর দলের ছায়া থাকার পরও পাঁচজন হেরে গেছেন। সাত কেন্দ্রে হাতপাখার চেয়ে নৌকার ভোট কম : ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের নৌকা হাতপাখা প্রতীকের চেয়ে কম ভোট পেয়েছে। নগরীর দৌলতপুর ও খালিশপুর থানায় অবস্থিত কেন্দ্রগুলো খুলনা-৩ আসনের মধ্যে; এ আসনের সংসদ-সদস্য শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দৌলতপুর থানার যে কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পরাজিত হয়েছে সেই এলাকায় নগর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের হেভিওয়েট নেতাদের বসবাস। একাধিক নেতাকর্মী জানান, এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের কর্মী থেকে নেতার পরিমাণ বেশি। যার কারণে এমন ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া এ এলাকা এক সময় বিএনপির ঘাঁটি ছিল। যার কারণে এমন পরাজয় হতে পারে। সঠিক নেতৃত্ব না থাকাও একটা বড় কারণ বলে একাধিক নেতাকর্মী জানান। নির্বাচন কমিশন সূত্র থেকে জানা যায়, সাতটি কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করেছে হাতপাখা। যার মধ্যে ৬টি কেন্দ্র নগরীর দৌলতপুর থানার ৩ ও ৪নং ওয়ার্ড এবং ১টি কেন্দ্র খালিশপুর থানার ৯নং ওয়ার্ড। এসব কেন্দ্র যাচাই করে দেখা যায়, দৌলতপুর থানার ৩নং ওয়ার্ডের ২৩নং কেন্দ্রের কার্ত্তিককুল সালেহা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (উত্তর পাশ) ভোটার ১৮৮৫। ভোট দিয়েছেন ১২০১ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৪৪৭ এবং হাতপাখা প্রতীক ৫১৭ ভোট। একই থানার ৪নং ওয়ার্ডে ৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫টিতে পরাজিত হয়েছে নৌকা প্রতীক। ২৫নং কেন্দ্র দেওয়ানা মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ভোটার ২২২৭। ভোট দিয়েছেন ১৪১৬ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৫৪৮ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৫৬৩। ২৭নং কেন্দ্র দেওয়ানা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (পশ্চিম ও দক্ষিণ) ভোটার ২০৮৬। ভোট দিয়েছেন ১৩৪৫ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৪৬১ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৬৭৭। ২৮নং কেন্দ্র দেওয়ানা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (পূর্ব ভবন) ভোটার ২১২৭। ভোট দিয়েছেন ১৪০০ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৫৪৪ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৬৫০। ২৯নং কেন্দ্র দেওয়ানা দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটার ২১১৪। ভোট দিয়েছেন ১৪৫২ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৫০৬ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৭৯৫। ৩০নং দেওয়ানা দক্ষিণপাড়া আজিজুল মেমোরিয়াল ক্লাব ও ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে ভোটার ২০৯৮। ভোট দিয়েছেন ১২৮৪ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৪৮১ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৬৭৬। এছাড়া খালিশপুর থানার ৯নং ওয়ার্ডের সরকারি দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ভোটার ২৮৫৩। ভোট দিয়েছেন ১৪৭৬ জন। নৌকা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৪৭৯ এবং হাতপাখা প্রতীক ভোট পেয়েছে ৮০৭।