ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক সারা পৃথিবী।

প্রকাশিতঃ জুন ২৯, ২০২৩ | ৬:১৮ অপরাহ্ণ
ড.আব্দুস সাত্তার কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ওয়াশিংটন ডি,সি

আজ ঈদুল আযহা । আযহা মানে, ত্যাগের ঈদ। আরবীতে ঈদুল আযহা অর্থ হচ্ছে- আত্মত্যাগের উৎসব। ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই ঈদুল আজহা হচ্ছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা হাজির হয় পশু প্রবৃত্তির কুরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার সুমহান বার্তা নিয়ে। এই ঈদ মহান কুরবানির শিক্ষা দেয়। কুরবানি হচ্ছে মূলত ত্যাগ, আত্মত্যাগ। ত্যাগের মধ্যেই এর সার্থকতা ও তাৎপর্য নিহিত। ত্যাগের আনন্দে উদ্ভাসিত পবিত্র ঈদুল আযহা মানুষকে মানবিক চেতনায় পুষ্ট হয়ে জগতের সকল সৃষ্টির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার শিক্ষা দেয়। উৎসাহ জোগায় একটি সাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হতে। ফলে সমগ্র মুসলিম জাহান তো বটেই সমগ্র বিশ্বমানবের কাছে পবিত্র ঈদুল আযহার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সীমাহীন। ঈদুল আযহা একই সঙ্গে পশু কুরবানী দেয়ার এবং ত্যাগের উৎসবের দিন। বস্তুত মানুষের স্বচ্ছ-নির্মল হৃদয়ে পশুর স্বভাব বিদ্যমান থাকে। তাতে মানুষের স্বভাবে প্রকাশ পায় হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহংকার, কপটতা, পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা ,লোভ লালসা ইত্যাদি। মানব হৃদয়ের এই পশুত্ব মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে প্রধান বাধা। তাই পশু কুরবানির পাশাপাশি নিজেদের পশুত্বকে কুরবানি দিতে হয় তাকওয়ার শাণিত প্রত্যাশা অন্তরে ধারণ করার মাধ্যমে। আর তখনই সার্থক হয় প্রতীকী পশুর কুরবানি। আল্লাহ তা’লার উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী উপলক্ষ্য হলেও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন। সেদিক থেকে ঈদুল আযহা অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি দিন। এক শ্রেণির মুসলিম ঈদুল আযহাকে কেবলই পশু কুরবানী দেয়ার প্রতিযগিতায় মেতে ঊঠেছে। দিনটির প্রধান উদ্দেশ্য মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ তা’লার প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও আনুগত্য তৈরি করা এবং ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তার উচ্ছেদ করে আত্মত্যাগের শিক্ষাকে জাগ্রত করে তোলা। আল্লাহ তা’লার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করাই ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা। তাই যাদের উপর কুরবানি আদায় করা আবশ্যক তাদের উচিত নির্দিষ্ট নিয়মে ও নির্দিষ্ট সময়ে পশু কুরবানি দেয়া। আর কুরবানির মূল উদ্দেশ্য যেহেতু নিজেদের পশু প্রবৃত্তির কুরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা, সেহেতু এই উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের গৌরব-মর্যাদার প্রতীক হিসেবে কুরবানিকে বিবেচনা করা উচিত নয়।ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে নিজের পশুত্বকে কুরবানি দেয়ার মাঝেই কুরবানির সত্যিকারের মাহাত্ম্য। এই কাজটি যারা করতে সক্ষম হবেন তাদের কুরবানিই কবুল হবে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে। কুরবানির পরিপূর্ণ ফজিলত অর্জন করতে প্রয়োজন ওই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা যা নিয়ে কুরবানি করেছিলেন আল্লাহর খলিল প্রিয় নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)। মনে রাখতে হবে, নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেবার এক দৃপ্ত শপথের নামই কুরবানি। প্রকৃতপক্ষে, কুরবানিদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালায় না, পশুর যবেহ করার সাথে সাথে তার ছুরি কেটে পাক সাফ করে দেয় তার ভেতরে থাকা সকল প্রকারের কুপ্রবৃত্তিকে। আমাদের সকলের উচিত ঈদুল আযহার প্রকৃত তাৎপর্য, গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ফজিলত অনুধাবন করে কুরবানির মৌলিক শিক্ষাকে ধারণ করে ইহ ও পারলৌকিক মুক্তির পথ অন্বেষণ করা। যেমনঃ- ১, ঈদের দিন গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সর্বোত্তম কাপড় পরা সুন্নত। ২, ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করা। ৩, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নেয়া ো কুশল বিনিময় করা। ৪, নামাজের পড়ে পশু জবাই করা। ৫, কোন মুমিনের সাথে দেখা হলে মুবারকবাদ দেওয়া। ৬, কোরবানির পশুর গোস্তত দিয়ে ইফতার করা। এছাড়া ও যাদের ওপর জাকাত ফরজ তাদের কোরবানি ওয়াজিব। ইমামের মতে সামর্থ্যবান সব মুসলিম নর-নারীর ওপর কোরবানি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হাদিসে বর্ণিত আছে সামর্থ্য থাকা সত্বেও যে কোরবানি করল না সে যেন ঈদগাহের নিকটেও না আসে। আজ এমন এক সময়ে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে, যখন সমাজ ক্রমেই অস্থিরতা ও নিষ্ঠুরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। পারস্পরিক সহমর্মিতার পথ থেকে মানুষ যোজন যোজন দূরে চলে যাচ্ছে। কোরবানির শিক্ষা মনে ধারণ করে, এই সংঘাত-সংঘর্ষের মনোবৃত্তি থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্ব তৈরি করতে হবে। সব ক্ষেত্রে ত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সেবার মানসিকতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে দুস্থ ও আর্ত মানুষের পাশে। আল্লাহ পাক তাওফিক প্রদান করুন। আমিন।