চা বন্দর ও ক্যাশলেসে বদলে গেছে পঞ্চগড়

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৪, ২০২৩ | ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

উত্তরে একেবারে শেষ প্রান্তের জেলা পঞ্চগড়। এক সময় অবহেলিত অনুন্নত এই জেলা নানা দিক থেকেই ছিল পিছিয়ে। তবে এখন বদলে গেছে সেই চিত্র। সরেজমিনে ঘুরে এবং বিভিন্ন সূচকের তুলনামূলক চিত্রে চোখ রাখলে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই এসেছে আমূল পরিবর্তন। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে খুলেছে অর্থনীতির দ্বার, তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। পঞ্চগড় এখন চায়ের সমতল স্বর্গ। দেশের প্রথম ভূমি ও গৃহহীন মুক্ত এ জেলার অজপাড়াগাঁয়েও জ্বলে বিদ্যুতের আলো। এখানে লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়াও। ক্যাশলেস সুবিধা পাচ্ছেন নাগরিকরা। জেলার সব ইউনিয়নে ক্যাশলেস সেবা চালু হয়েছে। এতে কমেছে দুর্নীতি ও নাগরিক ভোগান্তি। সড়কপথ ও রেলপথের উন্নয়ন সহজ করেছে যোগাযোগ। স্থানীয়রা বলছেন- এই উন্নয়ন জেলার ১২ লাখ মানুষের জনজীবনে সুফল বয়ে এনেছে, জীবনমান বদলে দিয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পঞ্চগড়ে অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়েছে। ২০২২ সালের ২১ জুলাই এ জেলা ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত হয়েছে। ছিটমহলের জীবনমানের উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। সমতলে চা চাষ, প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাপ্রসূত কর্মসূচি। বিগত বছরগুলোতে দেশে চা উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা পঞ্চগড়। তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ে আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র করা হচ্ছে, এতে এখানকার সমতলের চা চাষিরা লাভবান হবেন এবং চা উৎপাদন আরও বাড়বে। চায়ের সমতল স্বর্গ : জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সরকারি নথিপত্রে দেখা গেছে, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে পঞ্চগড়ের মানুষ সমতল ভূমিতে চা চাষের উদ্যোগ নেয়। এরপর ১৯৯৯ সালে এ জেলায় চা চাষ শুরু হয়। এ জেলায় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে চা উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার কেজি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি দুই লাখ ৭৪ হাজার ৬৩২ কেজিতে। ২০০৬ সালে চা আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯২৫ একর, যা বর্তমানে ১৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১২ হাজার ৭৯ একর। কাঁচা চা পাতা বিক্রি করে ক্ষুদ্র কৃষক বছরে একর প্রতি ২/৩ লাখ টাকা আয় করছে। বছরে এ শিল্প থেকে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে, যা চা খাতে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়। সরেজমিন দেখা যায়, জেলার কৃষকদের মধ্যেও চা চাষে আগ্রহ বেশি। নিজ উদ্যোগে প্রায় প্রতিটি পরিবারই ছোট-বড় চা-বাগান করতে শুরু করেছেন। চা চাষ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে ও বেশি লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। জীবন বদলে এক বন্দর : বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ঘিরে এখানকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির কাজে ব্যবহার হতো এটি। চতুর্দেশীয় এ স্থলবন্দর দিয়ে এখন মানুষও যাতায়াত করছেন। সরেজমিন দেখা যায়, সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে বন্দর ব্যবহার করে এ অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে যাচ্ছেন। নেপাল ও ভুটানের মেডিকেলে কলেজে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই পথ দিয়ে সহজে যেতে পারছেন। মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে সরকার। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, বন্দরের অবকাঠামোগত মূল উন্নয়নটা হয়েছে গত ১৪ বছরে। বর্তমানে এটিকে আধুনিক বন্দরে রূপান্তরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করে বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বন্দরের সাড়ে ১০ একর জায়গাও এখন যথেষ্ট মনে হচ্ছে না, আরও সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। প্রতিদিন ৩৫০-৪০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। এর বিপরীতে ৪০-৫০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়। ক্যাশলেস সুবিধা : ৬ জানুয়ারি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার তিরনইহাট ইউনিয়ন পরিষদে ক্যাশলেস সেবা শুরু হয়। বর্তমানে জেলার পাঁচটি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়নে এ সেবা চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে নগদ অর্থ ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মোবাইলের মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্ট করতে পারছেন বাসিন্দারা। তিরনইহাট ইউনিয়ন পরিষদে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাশলেসে ট্রেড লাইসেন্স, চারিত্রিক সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, ভূমিহীন সনদ, উত্তরাধিকার সনদ, অবিবাহিত সনদসহ ১৯টি সেবা দেওয়া হচ্ছে। নতুন জীবন ছিটমহলে : জেলার ৩৬টি ছিটমহলে ১১৯৩২৭৮ একর জমিতে মোট জনসংখ্যা ১৯ হাজার ২৪৩ জন। ৬৮ বছর ধরে ওই এলাকায় কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাবেক ছিটমহলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের পর ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩টি মহাবিদ্যালয় ও ১টি মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়েছে। ৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০২ কি.মি. পাকা রাস্তা, ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি ব্রিজ-কালভার্ট এবং ১১টি মসজিদ, ৪টি মন্দির, ৫টি বাজার, ১টি কবরস্থান ও ২টি নদীর ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে। সরেজমিন গারাতি ছিলমহলে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। বর্তমানে জায়গাটির নাম রাজমহল। বাসিন্দারা জানান, আগে অনেক কষ্টে ছিলাম। কোনো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাইনি। এখন আমরা অনেক শান্তিতে আছি। সরকারের সব সুবিধা পাচ্ছি, ভোটারও হয়েছি। ভূমি ও গৃহহীন মুক্ত জেলা : ছিলমহল থেকে ফেরার পথেই চোখে পড়ল একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় এখানে ১৬ জন সুবিধাভোগী থাকেন। মাঝ বয়সী এক নারী গরু গোয়ালে তুলছিলেন। নাম আকলিমা। রিকশাচালক স্বামীকে নিয়ে আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন এবং থাকতেন। এখন আপন ঠিকানা হয়েছে। আকলিমা বলেন, এখন অনেক ভালো আছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঠিকানা দিয়েছেন। প্রায় এক বছর ধরে এখানেই থাকছি। বর্তমান সরকারের গৃহীত অন্যতম প্রশংসিত উদ্যোগ আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ১ম, ২য় ও ৩য় পর্যায়ের মাধ্যমে মোট ৪৮৫০ জন ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও ঘর প্রদান করায় ২০২২ সালের ২১ জুলাই পঞ্চগড় জেলাকে দেশের প্রথম ভূমিহীন-গৃহহীনমুক্ত জেলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন : যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। সড়ক ও জনপদ বিভাগের আওতাধীন ৭২ কিমি. রাস্তা প্রশস্তকরণের মাধ্যমে এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর উপযুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও ২০০৮ সাল পর্যন্ত এলজিইডির আওতায় ৩০৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়ে এলজিইডির মাধ্যমে ৭৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৬৯০টি পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয় যার ফলে এ জেলায় মোট পাকা সড়কের পরিমাণ হয় প্রায় ১০৯৫ কিমি.। ২০০৮ সালের আগে পঞ্চগড় জেলার সঙ্গে সরাসরি ঢাকার ট্রেন চলাচল ছিল না। বর্তমানে পঞ্চগড়ের সঙ্গে অন্য জেলায় মোট ৬টি ট্রেন চলাচল করছে। শতভাগ বিদ্যুৎ : জেলায় কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত না হলেও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ থেকে নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আনা হয়েছে। ২০০৬ সালে এ জেলার মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল যেখানে ২০২৩ সালে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে।