আদালতে মামলা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আবেদন এবং আদেশ বা রায়ের অনুলিপি সংগ্রহের প্রতিটি পর্যায়ে সরকারকে নির্ধারিত ফি দিতে হয়। আদালতে এটি ‘কোর্ট ফি’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে জমি কেনা বা হস্তান্তর করতেও রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রয়োজন হয় বিভিন্ন দামের রেভিনিউ/জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে হওয়া মামলা গ্রহণের পাশাপাশি জমি নিবন্ধনসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। আবার যেখানে কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে বিক্রি হচ্ছে চড়ামূল্যে। স্বল্পতা রয়েছে কার্টিজ পেপারেরও। এতে বিপাকে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা।
দেশের সব জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখা থেকে কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করা হয়ে থাকে। জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে গত ১৮ জুন সর্বশেষ কোর্ট ফি ভেন্ডরদের সরবরাহ করা হয়েছিল। এর পর আর কোনো কোর্ট ফি সরবরাহ করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত কোর্ট ফি ছাড়াই বর্তমানে উচ্চ আদালতে মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। আপাতত মামলাগুলো গ্রহণ করে ক্রমানুসার (এন্ট্রি) নম্বর দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলা শুনানির সময় সংশ্লিষ্টদের কোর্ট ফি দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। একই অবস্থা ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলার অধস্তন আদালতেও। বাজারে সংকট রয়েছে রেভিনিউ স্ট্যাম্পেরও।
বিষয়টি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ারের নজরে নেওয়া হলে তিনি সমকালকে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নজরে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি, শিগগির সংকট কেটে যাবে।
জানা গেছে, বিদেশ থেকে কাগজ আনার পর গাজীপুর সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প ছাপা হয়। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে তা সারাদেশের ট্রেজারিতে পাঠানো হয়। ভেন্ডররা ব্যাংকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে চালান ট্রেজারিতে জমা দিলে স্ট্যাম্প সরবরাহ করে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৩৪টি ক্ষেত্রে কোর্ট ফি ব্যবহার হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক মামলা, ক্ষতিপূরণ, বাজারমূল্য আছে বা নেই– এ রকম স্থাবর সম্পত্তি, দখল পুনরুদ্ধার, নিষেধাজ্ঞা, মুসলিম আইনের অধীনে অগ্রক্রয়, দলিল রদ, দলিল সংশোধন, চুক্তি রদ, ঘোষণা মামলা-পরবর্তী প্রতিকার, চুক্তি প্রবল, ইজমেন্ট অধিকার, বন্ধক খালাস, ফোরক্লোসার, মোহরানা, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, বিবাহবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব, সাধারণ ঘোষণা, বাটোয়ারা ও পৃথক দখল, ভাড়া, ডিক্রি রদ, ঘোষণা ও নিষেধাজ্ঞা, আপিল, রিভিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হওয়া মামলা। এ ছাড়া জমি কেনাবেচাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেভিনিউ স্ট্যাম্প ব্যবহার হয়ে থাকে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট থেকে বাজারে কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের স্বল্পতা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের কিছু বেঞ্চ কোর্ট ফি ছাড়াই আপাতত মামলা গ্রহণের বিষয়টি অনুমোদন করেছেন। তবে এসব মামলা শুনানির সময় সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই কোর্ট ফি দাখিল করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে শরৎকালের অবকাশ (ছুটি) চলছে। স্বল্পসংখ্যক বেঞ্চে বিচারকাজ হলেও প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ মামলা হচ্ছে। অন্যদিকে ছুটি ব্যতীত নিয়মিত বেঞ্চে গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মামলা হয়। প্রতিটি মামলায় গড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একই অবস্থা অধস্তন আদালতেও।
ঢাকা আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ শফিকুর রহমান সমকালকে বলেন, বাজারে কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের স্বল্পতা থাকায় এর সুযোগ নিচ্ছে জালিয়াত চক্র। দেশের বিভিন্ন স্থানে নকল কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রি হচ্ছে। আদালতগুলোতে ‘স্ট্যাম্প ইইডি লাইট ডিটেক্টর’ ব্যবহার করায় নকল কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায় এবং ভূমি অফিসগুলোতে নকল কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
আদালতে ১৫০ টাকার কোর্ট ফি থেকে মামলাভেদে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার কোর্ট ফির প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন ধরনের সরকারি নথিতেও কোর্ট ফি লাগানোর প্রয়োজন পড়ে। বর্তমানে ২ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের কোর্ট ফি চালু আছে। এই কোর্ট ফি বিক্রি করে সরকার প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে থাকে। অন্যদিকে বাজারে বর্তমানে ৫, ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকা মূল্যমানের রেভিনিউ স্ট্যাম্প রয়েছে। দলিল মূল্য যা-ই হোক না কেন, নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা মূল্যমানের স্ট্যাম্প ব্যবহার করা যায়। এর বেশি মূল্যমানের স্ট্যাম্পের প্রয়োজন হলে বাকি টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে।
আদালত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্ট্যাম্প ভেন্ডররাই ডেমি, ফোলিও এবং কোর্ট ফি বিক্রি করে থাকেন। ১০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, ২ টাকার কোর্ট ফি ৫ টাকা, ১০ টাকার কোর্ট ফি ১৩ টাকা, ২০ টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প ও ৩০ টাকার কোর্ট ফি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ স্ট্যাম্প ভেন্ডার সমিতির মহাসচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পরও ট্রেজারি বিভাগ থেকে চাহিদা অনুযায়ী কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প সরবরাহ করা হচ্ছে না। ট্রেজারি বিভাগ বলছে, ডলার সংকটের কারণে কাগজের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় স্ট্যাম্প ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব জায়গায় কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের সংকট রয়েছে, সেখানে আপাতত এগুলো ছাড়াই মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরে শুনানির সময় সংশ্লিষ্টরা কোর্ট ফি ও রেভিনিউ স্ট্যাম্প দাখিল করবেন। আইনেও এ ব্যবস্থার কথা বলা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। শিগগির এ সংকট কেটে যাবে।