‘স্বতন্ত্র’র সুযোগ নিতে নৌকা বঞ্চিতদের দৌড়ঝাঁপ চলছে

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৮, ২০২৩ | ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

সিলেটের ১৯টি সংসদীয় আসনে নৌকা পেতে এবারই প্রথম রেকর্ড সংখ্যক মনোনয়ন ফরম ক্রয় করেছিলেন দলীয় নেতারা। সংগত কারণে মনোনয়ন চেয়ে বাদ পড়ার তালিকাও অনেক দীর্ঘ। মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন ১৭২ জন আর জমা পড়ে ১৪৮টি। কিনলেও জমা পড়েনি ২৪টি মনোনয়নপত্র। বাকি মনোনয়নপত্র থেকে বাছাই করে রোববার নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে মন্ত্রী, এমপি, নতুন মুখ মিলিয়ে ১৯টি আসনে ১৯ জন মনোনয়ন পান। ফলে দলীয় মনোনয়ন থেকে বাদ পড়েন ১২৪ জন নেতা। বাদ পড়াদের মধ্যে ৫ জন এমপিসহ প্রভাবশালী অনেক নেতা রয়েছেন। এ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে দলের ভেতরে-বাইরে ও এলাকায়। দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পর মনোনয়নবঞ্চিত বর্তমান এমপিসহ প্রায় এক ডজন নেতা ঝড়ের বেগে দৌড়াচ্ছেন। এমপি পদ আঁকড়ে ধরে রাখতে কেউ কেউ হাঁটছেন ভিন্ন পথে। দলীয়প্রধান ঘোষিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন তারা। এমপিদের কেউ কেউ রাজনৈতিক আদর্শবিরোধীদের সঙ্গেও সখ্য গড়তে উঠেপড়ে লেগেছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের তিনবারের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তিনি অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা কেলেঙ্কারির ঘটনায় বহুল আলোচিত। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় রতন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার বিকালেই তিনি প্রার্থিতা ঘোষণা করে শিগগির মনোনয়নপত্র জমা দেবেন বলে জানান। তার অনুসারীরা এমন তথ্য দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আরও কথা বলতে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এই আসনে রতনের বদলে নৌকার কান্ডারি করা হয়েছে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের নেতা অ্যাডভোকেট রঞ্জিত সরকারকে। প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষণার পরপরই রঞ্জিতের লোকজন রতনের এলাকায় তাৎক্ষণিক আনন্দ মিছিল করে মহড়া দেয়। অ্যাডভোকেট রঞ্জিত বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যার এই মূল্যায়ন আমি আজীবন মনে রাখব। কেউ বিদ্রোহী হলে সমস্যা নেই। আবার দলের নির্দেশনার মধ্য থেকেই নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টায়ও আছেন অনেকেই। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়েও নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগে এখন থেকেই সিরিয়াস ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে অংশ নিতে দলের আপত্তি না থাকায় আমি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নির্বাচনে বিএনপি থাকলে নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিতেন আমি তার পক্ষেই কাজ করতাম। হবিগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন তিনি। এই আসনে তৃতীয় দফায় নৌকার টিকিট পেয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। স্বতন্ত্র পরিচয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী উঁকি দিচ্ছে সিলেট-৬ আসনেও। এই আসনের এমপি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এবারের দলীয় মনোনয়নও তাকে দেওয়া হয়েছে। অথচ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন ওই আসনেই নির্বাচন করবেন বলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। নাহিদের নাম ঘোষণার পরপরই তিনি এই পোস্ট দেন। গত দুই দফায় মনোনয়ন না পাওয়া সরওয়ার হোসেন তার পোস্টে লেখেন, সেবক হিসাবে পাশে থাকার জন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হব ইনশাআল্লাহ। আমার প্রবাসী ভাই-বোনসহ সবার দোয়া চাই। অপরদিকে সিলেট-৩ আসনে বর্তমান এমপি হাবিবুর রহমান হাবিবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ আসনেই মনোনয়ন চেয়েছিলেন বিএমএ-এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল। তিনি সোমবার বলেন, দলের নির্দেশনা অনুসরণ করেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাই। এতেই শেষ নয়, ওই আসনেই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষাসৈনিক ও সাবেক সংসদ-সদস্য পীর হবিবুর রহমানের ছোট ছেলে ওলিউর রহমান। পীর হবিবুর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। এদিকে সিলেটের ১৯ আসনের মধ্যে প্রায় সমানসংখ্যক আসনেই নতুনদের দেওয়া হয়েছে মনোনয়ন। এর মধ্যে তিনটি আসনে নতুন প্রার্থীর মনোনয়নের ব্যাপারে সিলেটের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর হাত রয়েছে বলে বেশ আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে ‘ম্যাজিকম্যান’। মনোনয়নের তালিকা প্রকাশের পর গণমাধ্যমে আলাদাভাবে বিবৃতি পাঠিয়ে বিশেষভাবে তিনটি নতুন মুখকে অভিনন্দনও জানান তিনি। এ ব্যাপারে মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। প্রত্যেক আসনেই একাধিক যোগ্য প্রার্থী আছেন। তারপরও বঙ্গবন্ধুকন্যা বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রার্থী বাছাই করেছেন। শুধু সিলেটের রাজনীতি নয়, অতীতের সব নির্বাচন ও গত সিটি নির্বাচনে আমি যাদের সহযোগিতা পেয়েছি, তাদের মনোনীত করায় আমি হাইকমান্ডের প্রতি কৃতজ্ঞ। মনোনয়নপ্রাপ্তরা নতুন মুখ হলেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি দক্ষতা নৌকার বিজয় নিশ্চিত করবে। আমার মনের চাওয়ার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় এটাকে অনেকেই ‘ম্যাজিক’ মনে করছেন, আসলে তা নয়। এবার নৌকার কান্ডারি করা নতুন মুখগুলো হচ্ছে-মৌলভীবাজারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও শিল্পপতি জিল্লুর রহমান, সুনামগঞ্জে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান কবি ড. মোহাম্মদ সাদিক, বর্তমান আইজিপির সহোদর চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (আল আমিন চৌধুরী), হবিগঞ্জের রাজনীতিক শরীফ উদ্দিন মাস্টারের ছেলে অ্যাডভোকেট ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী। আর এজন্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, নেছার আহমেদ, শাহনেওয়াজ মিলাদ গাজী, আব্দুল মজিদ খানের মতো প্রভাবশালী প্রার্থীকে এবার বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুনদের সুযোগ দিয়ে মনোনয়ন তালিকা থেকে বাদ পড়া ৫ এমপি হচ্ছেন-সুনামগঞ্জ-১ আসনে ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সুনামগঞ্জ-২ আসনে জয়া সেনগুপ্ত, মৌলভীবাজার-৩ আসনে নেছার আহমদ, হবিগঞ্জ-১ আসনে শাহনেওয়াজ গাজী (মিলাদ গাজী) ও হবিগঞ্জ-২ আসনে আবদুল মজিদ খান। সিলেট-৫ আসনের হাফিজ আহমদ মজুমদার এমপি এবার মনোনয়নপত্র ক্রয় করেননি। তিনি গত নির্বাচনেই নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে তিনি নির্বাচন করতে বাধ্য হন।