আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ তৎপর ‘কিংস পার্টিগুলো’। অনেকটা হাঁকডাক দিয়ে এসব পার্টি মাঠে নামলেও এখন পর্যন্ত কোনো চমক নেই। তফশিল ঘোষণার শুরুতে গুঞ্জন ছিল বিএনপির অনেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও তৃণমূল বিএনপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এ দলগুলোর জোট হবে আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এখন পর্যন্ত কিংস পার্টিগুলো বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে পারেনি। শতাধিক আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভাগিয়ে নেওয়া চেষ্টায় কেউ সাড়া দেয়নি। তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (বহিষ্কৃত) শওকত মাহমুদসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। গুঞ্জন রয়েছে বিএনপি ঘেঁষা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে এসব দলে যোগ দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। অবশ্য তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএম কোনো কিংস পার্টি নয় বলেও দাবি করেন দল দুটির নেতারা। তারা এখনো আশাবাদী, বড় ধরনের চমক দেখাতে সক্ষম হবেন। তৃণমূল বিএনপি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৮ নভেম্বর থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে। দলটির দাবি, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ৪৯৫ জন মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য রয়েছেন চারজন। দলটির চেয়ারম্যান বিএনপি থেকে পদত্যাগকারী (সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান) শমসের মবিন চৌধুরী ও মহাসচিব বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত (দলের চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা) তৈমুর আলম খন্দকার। এর বাইরে পরিচিত কোনো রাজনীতিককে এখন পর্যন্ত দলটি টানতে পারেনি।
তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকটি দল নিয়ে জোট করছি। জোটের হয়েও প্রার্থী দেব। আবার নিজস্ব দলের পক্ষ থেকেও ৩০০ আসনে প্রার্থী দেব। অন্যদিকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (বহিষ্কৃত) শাহ মো. আবু জাফরসহ দলের সাবেক চার সংসদ সদস্য ২০ নভেম্বর বিএনএমে যোগ দেওয়ার সময় ঘোষণা দেন আরও চমক আসছে। আবু জাফর দলে যোগ দিয়েই বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। এরপর কয়েক দফায় নীলফামারী-১ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এসএম শাফি মাহমুদ ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজাসহ আরও কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য যোগ দেন। বিএনএমের মহাসচিব ড. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪৮৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বশেষ যোগ দিয়েছেন এইচএম গোলাম রেজা। তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য, সদ্য পদত্যাগ করে বিএনএমে যোগ দিয়েছেন। এ পর্যন্ত প্রায় দশজন সাবেক সংসদ সদস্য যোগ দিয়েছেন।
মোহাম্মদ শাহজাহান নিজেও চাঁদপুর-৪ ফরিদগঞ্জ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনএমের মহাসচিব বলেন, ‘বর্তমান কলুষিত রাজনীতির পরিবর্তে সুষ্ঠু ও জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে বিএনএমের নীতি ও আদর্শের অনুপ্রাণিত হয়ে সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, সেলিব্রেটি, ব্যবসায়ী, সবেক সরকারি কর্মকর্তাসহ বিপুলসংখ্যক যোগ্য লোক এই দলের পতাকাতলে আসছেন।
এই চমক অব্যাহত থাকবে। শোবিজ জগতের জনপ্রিয় তারকা ডলি সায়ন্তনীসহ কয়েকজন তারকাসহ বেশ কয়েকজন গুণী ব্যক্তি বিএনএমে যোগ দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আমরা বড় ধরনের চমক দেখাতে সক্ষম হবো।’
যদিও বিএনএমের প্রথম যোগদান অনুষ্ঠানে থাকা ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল ওহাব বলেন, ‘বিএনএমে তিনি যোগ দেননি। ওইদিন মামলার কাজে ব্যক্তিগত অ্যাডভোকেটের কাছে যান। অনুষ্ঠানে আমার একটা প্রতিপক্ষ আছে, তারা ওইদিন আমার নাম ঘোষণা করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘৫ বার বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৩ বার সংসদ সদস্য হয়েছি। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই আছি। যতদিন জীবিত আছি বিএনপিই করব। এর বাইরে অন্য কোনো দল করব না।’
এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান (বহিষ্কৃত) সাংবাদিক শওকত মাহমুদ নির্বাচন করবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি মনোনয়নপত্রও কিনেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ একে একরামুজ্জামান। তাকে মঙ্গলবার বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া আরও কয়েকটি আসন থেকে বিএনপি ঘেঁষা নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন তাদের নামের বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে। শওকত মাহমুদ বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে নির্বাচন করছি না। এলাকার চাপ থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করছি।’
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত প্রয়াত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার গড়া তৃণমূল বিএনপি গত ফেব্রুয়ারিতে আদালতের আদেশে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়। রাজপথে সক্রিয় দলগুলোকে পেছনে ফেলে আলোচনার জন্ম দিয়ে আগস্টে নিবন্ধন পায় বিএনপির সাবেক নেতাদের দল বিএনএম। এ দল দুটি কিংস পার্টি হিসাবে পরিচিত। তফশিলের পর অবশ্য বিএনএম মহাখালী থেকে গুলশানে আলিশান কার্যালয় নিয়েছে। অবশ্য সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান দাবি করেন, তারা সরকারের কোনো সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় দল করেননি। তিনি বিএনএমকে ‘কিংস পার্টি’ নামে অভিহিত না করারও অনুরোধ করেন।
এদিকে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ‘প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ফোরাম’ নামে আরেকটি দলের আত্মপ্রকাশ হয়। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাবেক ভিপি নাজিম উদ্দিন এবং জিএস আজিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন এই দলটির নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই। তাই তারা তৃণমূল বিএনপি থেকে নির্বাচন করবে বলে দলের নেতারা জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ফোরামের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন চট্টগ্রাম-৫ আসনে এবং সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন ফেনী-৩ আসনে প্রার্থী হতে তৃণমূল বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। নতুন নিবন্ধিত আরেকটি দল বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নিয়েও নানা গুঞ্জন আছে।
১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত অন্তত ১৬ জন সাবেক সংসদ সদস্য জানান, কিংস পার্টিগুলো প্রায় সব
আসনেই বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে ফোনে কিংবা সরাসরি যোগাযোগ করেছেন। যোগ দিতে তারাও প্রস্তাব পেয়েছেন। তবে তা গ্রহণ করেননি। যতই প্রলোভন দেখানো হোক না কেন, বিএনপি ভাঙতে পারবে না।
ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি অবস্থার সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে নেতা ভাগানোর চেষ্টা করেছিল সেই সময়ের কিংস পার্টিগুলো। পরে দলগুলো টেকেনি। এবার একই কায়দায় নেতা ভাগানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ বিএনপির। নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, ‘আমার কাছেও প্রস্তাব এসেছে। সংসদ সদস্য বানানোর প্রলোভন দেখানো হচ্ছে ওপরের মহল থেকে। স্পষ্ট করে বলেছি, জাতীয়তাবাদী আদর্শের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই।’
এখনো জোর গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন যাবেন বিএনএমে। তবে তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তাদের যতই ক্ষোভ থাকুক, বিএনপি ছেড়ে যাবেন না। দল বদলের চাপ এড়াতে আত্মগোপনে আছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির নিষ্ক্রিয়, বহিষ্কৃত এবং কোণঠাসা নেতাদের নানাভাবে প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, খুলনার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, কুমিল্লার মনিরুল হক সাক্কু, পাবনার সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম সরদার, কুমিল্লার আনোয়ারুল আজিম, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, রাঙামাটির দীপেন দেওয়ান, টাঙ্গাইলের লুৎফর রহমান খান আজাদ, লুৎফুর মতিন, নারায়ণগঞ্জের কাজী মনির, রাজবাড়ীর আলি নেওয়াজ খৈয়াম, নেত্রকোনার আশরাফউদ্দিন খান, নওগাঁর আনোয়ার হোসেন বুলু, বরিশালের মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, আব্দুস সাত্তার খান, বরগুনার নুরুল ইসলাম মনিসহ শতাধিক নেতা দল বদলের প্রস্তাব পেয়েছেন। দলে প্রভাবশালী এমন নেতাদের মধ্যে একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ বেশ কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যানকেও একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা কেউ রাজি হননি। এমনকি বহিষ্কৃত নেতারাও সাড়া দিচ্ছেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে এসব নেতা আত্মগোপনে আছেন। শুক্রবারের পর থেকে সক্রিয় হবেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকারের লোকজন মাঠে নেমেছে তথাকথিত কিংস পার্টিতে লোকজন নেওয়ার জন্য। বিভিন্ন দল থেকে নেতাদের আনতে হাটের মতো দরদাম চলছে। আওয়ামী লীগের কিংস পার্টিতে যোগ দিতে দেশপ্রেমিক বহু নেতাকে চাপ-প্রলোভন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছলে-বলে-কৌশলে টোপ দিয়ে কাউকে কাউকে বাগানো হচ্ছে। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের আন্দোলনে থেকে যারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।’
কিংস পার্টিগুলো বিএনপি নেতাদের নির্বাচনে নিতে না পারায়, ভোটে যেতে চাপ বেড়েছে নিবন্ধিত ছোট দলগুলোর ওপর। ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে নির্বাচনে গেছে কল্যাণ পার্টি। তারা জাতীয় পার্টি (মতিন) ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) নিয়ে গঠন করেছে যুক্তফ্রন্ট। জানা গেছে, নির্বাচনে লড়তে ঢাকা-৫ ও ঢাকা-১৪ আসন থেকে মনোনয়নপত্র তুলেছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। এছাড়া নির্বাচনে যাওয়ার জন্য বিএনপির সমমনা কয়েকটি নিবন্ধিত দলের ওপর চাপ রয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে বলেও জানা গেছে।