কারাগারে থেকেও নির্বাচনে জেতার ছক কষছেন ইমরান খান

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৪ | ১০:২১ অপরাহ্ণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স

আসন্ন ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন। এমন সময় সাইফার, তোশাখানা ও শরিয়াহ আইন লঙ্ঘন করে বুশরা বিবিকে বিয়ের মামলায় মোট ৩১ বছরের কারাভোগ করছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফের (পিটিআই) দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণে ইমরানকে দশ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং পিটিআইয়ের অন্যান্য নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে। দলটির নির্বাচনি প্রতীকও বাতিল করা হয়েছে। এ কারণে তার দলের নেতারা বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। পিটিআই মনে করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই রাজনৈতিক ধস কাটিয়ে উঠতে পারবে তারা। যদিও তাদের বেশিরভাগ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী নতুন ও আগে তারা নির্বাচনে অংশ নেননি। পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট থেকে পিটিআইয়ের প্রার্থী হয়েছেন রেহেনা ধর। ৭০ বছর বয়সি রেহেনার সহকর্মীদের অনেকেই ধরপাকড় ও মামলার ভয়ে পালিয়ে রয়েছেন। ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা রেহেনা বলেছেন, আমি ইমরান খানের সঙ্গে আছি, থাকব। জনসম্মুখে একা ছেড়ে দিলেও আমি ইমরানের পতাকা নিয়ে রাস্তায় নামব। গত নির্বাচনে রেহেনার ছেলে উসমান শিয়ালকোটে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সিনিয়র পিটিআই নেতা এবং ইমরান খানের যুব বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অক্টোবরের শুরুতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ-সহিংসতার পর, মামলা-হামলার ভয়ে পিটিআইয়ের বহু নেতাকর্মী পালিয়ে যান। উসমানের মতো অনেকেই এখনও কারাগারে রয়েছেন। কয়েকজন প্রার্থী কারাগার থেকেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। দোষী সাব্যস্ত না হলে কারাগার থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন তারা। অন্যরা পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে আছেন। এমন একজন প্রার্থী হলেন খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক মন্ত্রী আতিফ খান। মে মাস থেকে পালিয়ে আছেন তিনি। প্রচারণা চালাচ্ছেন ভিডিও বার্তার মাধ্যমে। তার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তার বিশ্বাস সুষ্ঠু বিচার পাবেন না তিনি। তাই প্রকাশ্যে আসছেন না। তাদের মতে, পিটিআই-এর সবচেয়ে বড় সমর্থক তরুণ ভোটাররা। তারা মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সক্রিয়। তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিই ব্যবহার করছেন তারা। পিটিআই-এর প্রচারণার জন্য প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের অফিসিয়াল এক্স, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকে লাখ লাখ ফলোয়ার যা অন্য দুটি প্রধান দল - পিপিপি এবং পিএমএল-এন – এর সমন্বিত সংখ্যার চেয়ে বেশি। তাছাড়া এসব মাধ্যমে ইমরান খানের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার মাধ্যমে তার বার্তা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে। এছাড়া ক্রিকেট-ব্যাট ছাড়াই পিটিআই একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে ভোটাররা নির্বাচনি এলাকায় পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীর প্রতীক সহজেই খুঁজে পেতে পারেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি সভা আয়োজনেও বাধার সম্মুখীন হয়েছে পিটিআই। পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীদের সভায় পুলিশ বাধা দিয়েছে। ধরপাকড় চালিয়েছে। যেভাবেই হোক, তাদেরকে প্রচারণা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও ইমরান খানের কারাদণ্ডের খবর ছাড়া অন্য কেন খবর প্রচারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমন সমস্যার সমাধান হিসেবে দলটি হাজির হয়েছে ভার্চুয়াল সমাবেশের ধারণা নিয়ে। পিটিআই-এর সোশ্যাল মিডিয়া প্রধান জিবরান ইলিয়াস শিকাগো থেকে ফোনে বিবিসিকে বলেছেন, এটি সস্তা, নিরাপদ ও দ্রুত। শারীরিক উপস্থিতির সমাবেশের তুলনায় হয়ত এগুলোর প্রভাব কম। কিন্তু আমাদের বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা তো করতে হবে। ইমরান খানকে ছাড়া আমরা আগে কোনও রাজনৈতিক সমাবেশ করিনি। তাকে ছাড়া এসব সমাবেশ কাজে আসবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। ইলিয়াস বলছেন, মানুষ ইমরান খানের বক্তব্য শুনতে চাইছে। কিন্তু তিনি কারাগারে। ফলে সমাধান হিসেবে ডিসেম্বরে একটি অনলাইন সমাবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ইমরানের বক্তব্য প্রচার করা হয়েছিল। এমন উদ্যোগগুলোতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পিটিআই সমাবেশকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিকবার ব্যঘাত ঘটেছিল। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩০ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। ফলে পিটিআই-এর বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টায় অনলাইন প্রচারণায় সীমাবদ্ধতা থাকবে। অতীতেও এমন হয়েছে। গত নির্বাচনে নওয়াজ শরিফ কারাগারে থাকার সময়ও এমনটি ঘটেছে। এমন অবস্থায় ভোটাররা মনে করতে পারেন, পিটিআই বা ইমরান খানের জয়ের আশা নেই। সেক্ষেত্রে তাদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির হার অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থায় শুধু ইমরান খানের নামের ম্যাজিক কি পিটিআইকে জিতিয়ে দিতে পারবে? কুগেলম্যানও বলছেন, ভোটাররা মনে করতে পারেন পিটিআই-এর জয়ের কোনও সম্ভাবনা নাই তা ভোট দিয়ে লাভ নাই। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে ইমরান খানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এত কিছু পরও দলটির নেতৃত্ব ভোটারদের ভোট দিতে কতটা প্রেরণা যোগাতে পারবেন। দলটির অনেকে মনে করেন, যদি মানুষ ভোট দিতে বের হয় এবং উপস্থিতি বেশি হয়, তাহলে হয়ত অলৌকিক কিছু ঘটবে এবং দলটি জয়ী হতে পারে।